(ক) তাওহীদ-উর-রবুবিয়্যাহ:

(ক) ১জগতসমূহের রব মহিমান্বিত আল্লাহর পরিচয়:

তিন প্রকার তাওহীদের কেন্দ্র বিন্দু জগতসমূহের রব মহিমান্বিত আল্লাহর পরিচয় সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ও নোটসহ) উপস্থাপিত হলো-

➧ “আর আলোকিত হলো যমীন তার প্রভূর আলোতে।” (সূরা আয-যুমার, আয়াত নং ৬৯)

➧ “আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের জ্যোতি আল্লাহ্‌ আসমানসমূহ ও যমীনের নূর (জোত্যি বা আলো) ।” (সূরা নূর, আয়াত নং ৩৫)

ব্যাখ্যা: নূরের সংজ্ঞাঃ নূর শব্দের আভিধানিক অর্থ আলো। [ফাতহুল কাদীর] কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর জন্য নূর কয়েকভাবে সাব্যস্ত হয়েছে।

এক) আল্লাহর নাম হিসাবে। যে সমস্ত আলেমগণ এটাকে আল্লাহর নাম হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন তারা হলেন, বাইহাকী, কুরতুবী, ইবনু তাইমিয়াহ, ইবনুল কাইয়্যেম, ইবনে হাজার, আস-সা‘দী প্রমুখ।

দুই) আল্লাহর গুণ হিসাবে। যেমন-

আল্লাহ্‌ বলেন, “আর আলোকিত হলো যমীন তার প্রভূর আলোতে।” (সূরা আয-যুমার, আয়াত নং ৬৯)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ ‘আসমান ও যমীনের যাবতীয় নূর তাঁরই চেহারার আলো। [আবু সাইদ আদ-দারেমী]

তিন) আল্লাহর নূরকে আসমান ও যমীনের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেনঃ “আল্লাহ্‌ আসমান ও যমীনের নূর।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্‌, আপনার জন্য সমস্ত প্রশংসা, আপনি আসমান ও যমীনের আলো এবং এ দু’য়ের মধ্যে যা আছে তারও (আলো)...। [বুখারী ১১২০, মুসলিম ১৯৯]

চার) আল্লাহর পর্দাও নূর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘তাঁর পর্দা হলো নূর।’ [মুসলিম ২৯৩] আর আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি‘রাজের রাতে এর নূরই দেখেছিলেন। সাহাবাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেনঃ ‘আপনি কি আপনার প্রভূকে দেখেছিলেন? তিনি বললেনঃ নূর! কিভাবে তাকে দেখতে পারি?’ [মুসলিম ২৯১] অপর বর্ণনায় এসেছে, ‘আমি নূর দেখেছি।’ [মুসলিম ২৯২] এ হাদীসের সঠিক অর্থ হলো, আমি কিভাবে তাঁকে দেখতে পাব? সেখানে তো নূর ছিল। যা তাকে দেখার মাঝে বাঁধা দিচ্ছিল। আমি তো কেবল নূর দেখেছি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, আল্লাহর পর্দাও নূর। এ নূরের পর্দার কারণেই সবকিছু পুড়ে যাচ্ছে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘যদি তিনি তাঁর পর্দা খুলতেন তবে তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তাঁর নজর পড়ত সবকিছু তাঁর চেহারার আলোর কারণে পুড়ে যেত।’ [মুসলিম ২৯৩-২৯৫]

সুতরাং আসমান ও যমীনের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দু‘ধরনের নূরই আল্লাহর। প্রকাশ্য নূর যেমন- আল্লাহ্‌ তা‘আলা স্বয়ং নূর। তাঁর পর্দা নূরের। যদি তিনি তাঁর সে পর্দা উন্মোচন করেন, তাহলে তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তাঁর দৃষ্টি পড়বে তার সবকিছুই ভস্ম হয়ে যাবে। তাঁর নূরেই আরশ আলোকিত। তাঁর নূরেই কুরসী, সূর্য, চাদ ইত্যাদি আলোকিত। অনুরূপভাবে তাঁর নূরেই জান্নাত আলোকিত। কারণ, সেখানে তো আর সূর্য নেই।

আর অপ্রকাশ্য নূর যেমন- আল্লাহর কিতাব নূর [সূরা আল-আ‘রাফঃ ১৫৭], তাঁর শরীয়ত নূর [সূরা আল-মায়েদাঃ ৪৪], তাঁর বান্দা ও রসূলদের অন্তরে অবস্থিত ঈমান ও জ্ঞান তাঁরই নূর [সূরা আয-যুমারঃ ২২]। যদি এ নূর না থাকত তাহলে অন্ধকারের উপর অন্ধকারে সবকিছু ছেয়ে যেত। সুতরাং যেখানেই তাঁর নূরের অভাব হবে সেখানেই অন্ধকার ও বিভ্রান্তি দানা বেঁধে থাকে। আর এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো‘আ করতেনঃ ‘হে আল্লাহ্‌, আমার অন্তরে নূর দিন, আমার শ্রবণেন্দ্রীয়ে নূর দিন, আমার দৃষ্টিশক্তিতে নূর দিন, আমার ডানে নূর দিন, আমার বামে নূর দিন, আমার সামনে নূর দিন, আমার পিছনে নূর দিন, আমার উপরে নূর দিন, আমার নীচে নূর দিন। আর আমার জন্য নূর দিন অথবা বলেছেনঃ আমাকে নূর বানিয়ে দিন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আর আমার জন্য আমার আত্মায় নূর দিন। আমার জন্য বৃহৎ নূরের ব্যবস্থা করে দিন। [বুখারী ৬৩১৬, মুসলিম ৭৬৩]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘হে আল্লাহ্‌, আমাকে নূর দিন, আমার জন্য আমার অস্থি ও শিরা-উপশিরায় নূর দিন। আমার মাংসে নুর দিন, আমার রক্তে নূর দিন, আমার চুলে নূর দিন, আমার শরীরে নূর দিন।’ অপর বর্ণনায় এসেছে, ‘হে আল্লাহ্‌, আমার জন্য আমার কবরে নূর দিন। আমার হাড্ডিতে নূর দিন।’ [তিরমিযী ৩৪১৯]

আয়াতে আল্লাহ্‌ তা‘আলার সত্তার জন্য ব্যবহৃত ‘নূর’ শব্দটির অর্থ কোন কোন তাফসীরবিদের মতে ‘মুনাওয়ের' অর্থাৎ ঔজ্জ্বল্যদানকারী। তখন আয়াতের অর্থ হয় যে, আল্লাহ্‌ তা‘আলা নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে বসবাসকারী সব সৃষ্টজীবের নূরদাতা। এই নূর বলে হেদায়াতের নূর বুঝানো হয়েছে। [-বাগভী] (তাফসীরে আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)

নূরের সংজ্ঞা: যে বস্তু নিজে নিজে প্রকাশমান ও উজ্জ্বল এবং অপরাপর বস্তুকেও প্রকাশমান ও উজ্জ্বল করে। (ঈমাম গাযযালী, তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন)

➧ “যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, তারপর আমরা উভয়কে পৃথক করে দিলাম; এবং প্রাণবান সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?” (সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং ৩০)

নোট: গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের ধারনা হয়েছে যে ১ হাজার ৯ শত কোটি বছর আগে পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিলো না। ছিল না চাঁদ সূর্য, গ্রহ-তারা, ছায়াপথ অর্থাৎ কোন পৃথিবী ও আকাশমন্ডলী। সৃষ্টির সূচনালগ্নে বিপুল উত্তপ্ত ও অপরিসীম ঘনত্ব বিশিষ্ঠ ক্রমঅদৃশ্যমান ক্ষুদ্রাকৃতির এক ফায়ারবল বা অগ্নিগোলক ছিল। এমনি শুন্য সময়ে, ঐ অগ্নিগোলকের বিগ ব্যাং বা মহাবিষ্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্মের সূচনা হয় এবং সেইসাথে সম্পসারণ ঘটে ঐ অগ্নিগোলকের। পরবর্তীতে তাপমাত্রা কমে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রথমে কুয়াশার, অতঃপর ছায়াপথ, নক্ষত্রসমূহ এবং গ্রহ-উপগ্রহ ইত্যাদি সৃষ্টি হয় যার সবই প্রথমে ফায়ারবল বা অগ্নিগোলক আকারে সংযুক্ত ছিল। সাড়ে ৪ শত কোটি বছর আগে আন্ততারকামন্ডলীয় গ্যাস ও ধুলিকণা দ্বারা সৃষ্টি হয়ে আমাদের পৃথিবী গ্রহের যাত্রা শুরু হয়। সৃষ্টি হয় বিভিন্ন গ্যাসের। একপর্যায়ে পৃথিবীপৃষ্ঠ ঠান্ডা হলে বাষ্পীয় জলকণা ঘনীভূত হয়ে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। তাতে সৃষ্টি হয় সাগর, মহাসাগর, নদ-নদী ও হ্রদের। অতঃপর পানি থেকে প্রাণবান সকল কিছু সৃষ্টি হয়। (সংক্ষেপিত, কোরআনে বিজ্ঞান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)

উপরোক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে সূরা বাকারার ১১৭ নং আয়াত এবং সূরা নূরের ১৩৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যার আলোকে মহান আল্লাহর সত্ত্বা, ক্ষমতা ও সৃষ্টি সম্পর্কে আমরা অধিকতর স্বচ্ছ্ ধারনা পেতে পারি।

➧ “বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। এবং তার সমতুল্য কেউ নেই।” (সূরা ইখলাস, আয়াত নং ১-৪)

➧ “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৫৫)

➧ “তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” (সূরা হাদীদ, আয়াত নং ৪)

নোট: আল্লাহর সৃষ্টি সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি মাইল দুরে অবস্থিত। অথচ তার আলো, উত্তাপ ও রশ্মি পৃথিবীতে মানুষসহ সবকিছুকেই সর্বদিক থেকেই পরিবেষ্টন করে বা সঙ্গে থাকে। ৫০০ বা ৫০০০ মাইল দুরে গেলেও আমরা তাঁর ক্ষমতার/আওতার বাইরে যেতে পারি না। এমনকি সূর্যের পলকহীন দৃষ্টিরও বাইরে যেতে পারি না। তাহলে কিভাবে আমরা ঐ সূর্যের সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রনকারী আল্লাহর নাগালের বা দৃষ্টির বাইরে যেতে পারি! যদিও সূর্যের আলো, উত্তাপ ও কিরণ সূর্য নয় কিন্তু সেসব সূর্য থেকে আলাদা কিছুও নয়। বিশাল সূর্যের এ বাস্তব উদাহরণ “তোমরা যেখানেই থাকো না কে কেন- তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা” এই আয়াতের মর্ম অনুধাবনে সহায়ক। যদিও স্বত্তা ও পরিপূর্ণ গুনাবলীতে কোন সৃষ্টি আল্লাহর সমতুল্য হতে পারে না। উপরোক্ত আয়াতসমূহের আলোকে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। অধিকন্তু সর্বশ্রোতা ও দ্রষ্টা মহিমান্বিত আল্লাহকে সর্বদা স্মরণে রাখা এবং আমাদের জীবনাচরণে তার বহিঃপ্রকাশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রাসঙ্গিক, রোবট বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে বসেই যেমন মেশিনের সাহায্যে মঙ্গল গ্রহের বিভিন্ন ছবি গ্রহণ ও এখানে থেকে রোবট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তদ্রুপ সপ্তাকাশের উপর আরশে আজীমে থেকে আল্লাহপাক নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। আর আল্লাহর কুদরতী সিংহাসন আকাশ ও যমীন বেষ্টন করে আছে। (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৫৫ দেখুন)

এ সকল আলোচনার উদ্দেশ্য একটিই, যেন আমরা আল্লাহর কুদরত দেখে, আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর দিক নির্দেশনা (হেদায়েত) মেনে সফলকাম হতে পারি।

➧ জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ) -এর কাছে উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা শীঘ্রই তোমাদের রব্বকে দেখতে পাবে, যেমনি তোমরা এ চাঁদটিকে দেখতে পাচ্ছ। অথচ এটিকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধে হচ্ছে না। অতএব, তোমরা সক্ষম হলে সূর্যোদয়ের আগের সালাত (ফজর) ও সূর্যাস্তের আগের সালাত (আছর) আদায় করতে তোমরা যেন পরাজিত না হও। তাহলে তাই কর। (সহীহ বুখারী হা/৭৪৩৪, বুখারী আধুনিক প্রকাশনী-৬৯১৭, বুখারী ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৬৯২৮)

➧ ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, “আদিতে একমাত্র আল্লাহ-ই ছিলেন। তিনি ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।” (বুখারী, হা/৩১৯১, সংক্ষেপিত)