তাফসীর ইবনে কাছীর থেকে উদ্ধৃতি:

তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) ও হযরত সাঈদ (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে ভাষণ দান কালে বলেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তাঁর শপথ! এ কথা তিনি তিনবার বলেন। অতঃপর তিনি মাথা নীচু করেন। আমরা সকলেই নীচু করি এবং জনগণ কাঁদতে আরম্ভ করে। আমাদের অন্তর কেঁপে উঠে যে, আল্লাহর রসূল (সঃ) কোন্ জিনিসের উপরই বা শপথ করলেন এবং নীরবতাই বা অবলম্বন করলেন কেন? অল্পক্ষণ পরে তিনি মস্তক উত্তোলন করেন এবং তাঁর চেহারা প্রফুল্ল ছিল, যা দেখে আমরা এত খুশী হই যে, আমরা লাল রঙ্গের উট পেলেও এত খুশী হতাম না। তখন তিনি বলতে আরম্ভ করেনঃ “যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, যাকাত আদায় করে এবং সাতটি কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকে, তার জন্যে জান্নাতের সমস্ত দরজা খুলে রাখা হবে এবং তাকে বলা হবে-নিরাপত্তার সাথে তথায় চলে যাও।

তাতে যে সাতটি পাপের উল্লেখ আছে তার বিস্তারিত বিবরণ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে নিম্নরূপ এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- ‘ধ্বংসকারী (দুনিয়া ও আখিরাতে) সাতটি পাপ হতে তোমরা বেঁচে থাক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রসূল (সঃ)! ঐপাপগুলো কি?’তিনি বললেন ‘ (১) আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করা, (২) যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ তাকে হত্যা করা, তবে শরীয়তের কোন কারণে যদি তার রক্ত হালাল হয় সেটা অন্য কথা, (৩) যাদু করা, (৪) সুদ ভক্ষণ করা, (৫) পিতৃহীনের মাল ভক্ষণ করা, (৬) কাফিরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করা, (৭) সতীসাধ্বী পবিত্র মুসলমান নারীদেরকে অপবাদ দেয়া।

মুসতাদরাক-ই হাকিমের বর্ণনায় ১) পিতামাতার অবাধ্য হওয়া এবং ২) জীবন মরণের কিবলাহ বায়তুল্লাহ শরীফের মর্যাদা ক্ষুন্ন করাকেও মহাপাপ বলে উল্লেখ রয়েছে।

বুখারী ও মুসলিমের অপর বর্ণনায় ১) শিরক করা, ২) মিথ্যা কথা বলা, ৩) মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, ৪) পিতামাতার অবাধ্যতা, ৫) অভাবের ভয়ে সন্তান হত্যা, ৬) প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া, ৭) মিথ্যা শপথ করা ও ৮) পিতামাতাকে অভিশাপ দেয়াকে (অন্যের মা বাপকে বলে নিজের মা বাপকে বলিয়ে নেয়া) মহাপাপ বলে উল্লেখ রয়েছে।

তাফসীর ইবনে মির দুওয়াই এর বর্ণনায় মদ্যপান করাকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ বলা হয়েছে। তাফসীর ইবনে জারীরে ১) হিজরতের পর পুনরায় কাফিরদের দেশে এসে বসতি স্থাপন করা, ২) ধোকা দেয়া ও ৩) (আমানতের) খিয়ানত (বিশ্বাস ঘাতকতা) করাকে মহাপাপ বলে উল্লেখিত হয়েছে।

মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় ১) চুরি, ২) ব্যভিচার করাকে এবং মুসনাদ ইবনে আবী হাতীমের বর্ণনায় ১) আল্লাহর রহমত ও করুনা হতে নিরাশ হওয়া, ২) তাঁর শাস্তি হতে নির্ভয় হওয়া, ৩) জামাত হতে পৃথক হওয়া এবং ৪) পিতামাতাকে গালি দেয়া (অন্যের মা বাপকে গালি দেয়ার মাধ্যমে নিজের মা বাপকে বলিয়ে নেয়া) মহাপাপ বলা হয়েছে।

উল্লেখিত পাপসমূহকে কবীরা বলার ভাবার্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র এগুলোই কবীরা গুনাহ, যেমন কারও কারও এ ধারণা রয়েছে। কিন্তু এটা একেবারেই ভুল কথা, বিশেষ করে ঐ সময়, যখন এর বিপরীতে দলিল বিদ্যমান থাকে। আর এর সাথে নিম্নোক্তগুলোকেও মহাপাপ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে:

১) বিনা ওযরে রমজানের রোজা পরিত্যাগ করা, ২) ইচ্ছাকৃত ভাবে নামাজ ছেড়ে দেয়া, ৩) বিনা ওযরে দুই নামাজকে একত্রে আদায় করা বা ৪) সময়ের পূর্বে তা আদায় করা, ৫) ওজনে কম দেয়া, ৬) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, ৭) কোন মুসলমানকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করা, ৮) ঘুষ নেয়া, ৯) পুরুষে পুরুষে নির্লজ্জতার কাজে লিপ্ত হওয়া (সমকামিতা), ১০) জবরদখল করা, ১১) সাহাবীগণকে গালি দেয়া, ১২) জেনে শুনে রাসূলের (ﷺ) উপর মিথ্যা আরোপ করা, ১৩) বিনা কারণে সাক্ষ্য গোপন করা, ১৪) স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করা, ১৫) যাকাত দেয়া বন্ধ করা, ১৬) ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ না করা, ১৭) কুরআন শিক্ষা করে ভুলে যাওয়া, ১৮) প্রাণীকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা, ১৯) বিনা ওযরে স্ত্রীর তার স্বামীর কাছে না যাওয়া, ২০) আলেম ও কারীদের ক্ষতিসাধন করা, ২১) যিহার করা (বিবাহ নিষিদ্ধ এরূপ কোন নারীর কোন অঙ্গের সঙ্গে স্ত্রীর তুলনা করাকে যিহার বলে), ২২) শুকরের মাংস ভক্ষণ করা এবং ২৩) মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণ করা; তবে নিতান্ত প্রয়োজনে জীবন রক্ষার্থে খেলে সেটা অন্য কথা, ২৪) বাপ-মাকে অসন্তুষ্ট করা, ২৫) পরিতৃপ্তির পর অতিরিক্ত পানি প্রয়োজনবোধকারীদের না দেয়া, ২৬) আল্লাহ তাআলার সন্তান ও স্ত্রী সাব্যস্ত করা, ২৭) বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, ২৮) বিনা কারণে পিতামাতাকে কাঁদানো, ২৯) মসজিদে হারামে ধর্মদ্রোহিতা।

(তাফসীর ইবনে কাছীর, সূরা নিসা, আয়াত নং ৩১ এর ব্যাখ্যা, সংক্ষেপিত)

নোট: ইমাম আযযাহাবী (র:) তাঁর কিতাবুল কাবায়ের বা কবীরা গুনাহ বইয়ের (যা বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে) মধ্যে উপরে উল্লেখিত প্রায় সবগুলো গুনাহসহ ৭০ টি গুনাহের দলিলসহ বর্ণনা দিয়েছেন। যার মধ্যে ১) যুলুম বা অত্যাচার করা (যা শারীরিক, আর্থিক, ইজ্জত সম্মান ও মানসিক হতে পারে), ২) অহংকার করা, ৩) হারাম খাওয়া ও হারাম পথে উপার্জন ও ভোগ করা, ৪) চোগলখুরী করা, ৫) গীবত করা, ৬) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া, ৭) আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো নামে জবেহকৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া, ৮) ওসিয়ত দ্বারা অনিষ্ঠ করা (ওয়ারিশকে বঞ্চিত করা), ৯) স্বামী স্ত্রীর পরস্পরের অধিকার লঙ্ঘন, ১০) নিজ পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতার প্রশ্রয়দান, ১১) নারীর সাথে পুরুষের অথবা পুরুষের সাথে নারীর সাদৃশপূর্ণ বেশভূষা গ্রহণ, ১২) দান করে খোঁটা দেয়া এবং অনুগ্রহের প্রচার করা, ১৩) প্রস্রাব থেকে পবিত্র না হওয়া, ১৪) তাকদীরকে অস্বীকার করা, ১৫) ওয়াদা অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, ১৬) বৈধ কর্তৃপক্ষের অবাধ্য হওয়া, ১৭) জুয়া খেলা, ১৮) কৃপণতা, অপচয় ও অপব্যয় তথা অবৈধ ও বিশৃঙ্খল ব্যয় ইত্যাদি অন্যতম।