এই সম্পর্কিত আয়াত, হাদীস (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা) উদ্ধৃতি এবং নোটসহ উপস্থাপন করা হলো যা আত্নসংশোধনে একান্ত সহায়ক:

আল্লাহ অবশ্যই সেইসব লোকের তওবা কবূল করিবেন যাহারা ভূলবশত মন্দ কাজ করে এবং সত্ত্বর তওবা করে, ইহারাই তাহারা, যাহাদের তওবা আল্লাহ কবূল করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়তওবা তাহাদের জন্য নহে যাহারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাহাদের কাহারও মৃত্যু উপস্থিত হইলে সে বলে, ‘আমি এখন তওবা করিতেছি’। তাহাদের জন্যও নহে, যাহাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। ইহারাই তাহারা যাহাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তির ব্যবস্থা করিয়াছি।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৭-১৮)

➧ “যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকর্ম করে, সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হয়। এবং যাহারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অসার ক্রিয়াকলাপের সম্মুখীন হইলে স্বীয় মর্যাদার সঙ্গে উহা পরিহার করিয়া চলে। এবং যাহারা তাহাদের প্রতিপালকের আয়াত স্মরণ করাইয়া দিলে উহার প্রতি অন্ধ এবং বধিরসদৃশ আচরণ করে না।” (সূরা ফুরকান, আয়াত নং ৭১-৭৩)

➧ আর আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি, যে তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তারপর সৎপথে অবিচল থাকে। (সূরা ত্ব-হা, আয়াত নং ৮২)

➧ তবে যে ব্যক্তি তওবা করে ও সৎকাজ করে, সে অবশ্যই সফলকাম হবে। (সূরা কাসাস, আয়াত নং ৬৭)

➧ “হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর-বিশুদ্ধ তওবা; তাহা হইলে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলি মোচন করিয়া দিবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করিবেন জান্নাতে, যাহার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সেই দিন আল্লাহ্ লজ্জা দিবেন না নবীকে ও তাহার মু’মিন সঙ্গীদেরকে, তাহাদের জ্যোতি তাহাদের সম্মুখে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হইবে। তাহারা বলিবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (সূরা তাহরীম, আয়াত নং ৮)

ব্যাখ্যা: তওবা করার সঠিক নিয়ম পদ্ধতি

তওবার করার সঠিক নিয়ম পদ্ধতি হল, (ক) তওবা একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। (খ) যে গুনাহ হতে তওবা করা হচ্ছে, তা সত্বর ত্যাগ করতে হবে। (গ) এই গুনাহ করে ফেলার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে। (ঘ) আগামীতে এই গুনাহ 'আর করব না' বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। (ঙ) যদি এই গুনাহের সম্পর্ক কোন বান্দার অধিকারের সাথে হয়, তবে যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার সাথে মিটমাট করে নিতে হবে। যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। পক্ষান্তরে কেবল মৌখিক তওবা করার কোন অর্থ হয় না। (তাফসীর আহসানুল বয়ান, সংক্ষেপিত)

➧ বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছ---আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমাদের নিকট শাস্তি আসার পূর্বে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর (অর্থাৎ তাওবাহ কর যার অন্যতম শর্ত হল অবিলম্বে পাপাচার থেকে বিরত হওয়া এবং পুনরায় তাতে লিপ্ত না হবার দৃঢ় সংকল্প করা); শাস্তি এসে পড়লে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের ওপর অতর্কিতে শাস্তি আসার পূর্বে তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের তরফ থেকে যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ অবতীর্ণ করা হয়েছে, তার অনুসরণ কর। যাতে কাউকেও বলতে না হয়, ‘হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি তো শৈথিল্য করেছি। আর অবশ্যই আমি ঠাট্টা-বিদ্রূপকারীদের একজন ছিলাম।’ অথবা কেউ না বলে, ‘আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করলে আমি তো অবশ্যই সাবধানীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ অথবা শাস্তি প্রত্যক্ষ করলে যেন কাকেও বলতে না হয়, ‘হায়! যদি একবার পৃথিবীতে আমার প্রত্যাবর্তন ঘটত, তাহলে আমি সৎকর্মপরায়ণ হতাম।’ (আল্লাহ বলবেন,) প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, আমার নিদর্শনসমূহ তোমার নিকট এসেছিল; কিন্তু তুমি ঐগুলিকে মিথ্যা বলেছিলে এবং অহংকার করেছিলে। আর তুমি ছিলে অবিশ্বাসীদের একজন। (সূরা যুমার, আয়াত নং ৫৩-৫৯)

ব্যাখ্যা: বান্দাদের নৈরাশ্যকে ভেঙ্গে দিয়ে তাদের ক্ষমা করে দেয়ার আশা প্রদান করে মহান আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাওবা ও সৎ কাজের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায় (আর তাওবার অন্যতম শর্ত হল অবিলম্বে পাপাচার থেকে বিরত হওয়া এবং পুনরায় তাতে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা), এতে যেন মোটেই বিলম্ব না করে। এমন যেন না হয় যে, আল্লাহর আযাব এসে পড়ে, যখন কারো কোন সাহায্য কাজে আসবে না।

অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে উত্তম যা অবতীর্ণ হয়েছে অর্থাৎ আল-কুরআন, তার তোমরা অনুসরণ কর, তোমাদের উপর অতর্কিতভাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে শাস্তি আসার পূর্বে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বান্দা যে আমল করবে এবং যা কিছু বলবে, তাদের সেই আমল ও সেই উক্তির পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা তার খবর প্রদান করেছেন। আর প্রকৃতপক্ষে তাঁর চেয়ে বেশী খবর আর কে রাখতে পারে? আর কেই বা তার চেয়ে সত্য ও সঠিক খবর দিতে পারে? আল্লাহ তাআলা পাপীদের উপরোক্ত তিনটি উক্তির বর্ণনা দিয়েছেন।

অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ এই সংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়াও হয় তবে তখনো তারা হিদায়াত কবুল করবে না, বরং নিষিদ্ধ কাজগুলো আবার করতে থাকবে। এখানে তারা যা কিছু বলছে সবই মিথ্যা প্রমাণিত হবে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক জাহান্নামীকে তার জান্নাতের বাসস্থান দেখানো হবে। ঐ সময় সে বলবেঃ যদি আল্লাহ তা'আলা আমাকে হিদায়াত দান করতেন। সুতরাং এটা তার জন্যে হবে দুঃখ ও আফসোসের কারণ। আর প্রত্যেক জান্নাতীকে তার জাহান্নামের বাসস্থান দেখানো হবে। তখন সে বলবেঃ যদি আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দান না করতেন (তবে আমাকে এখানেই আসতে হতো) । সুতরাং এটা হবে তার জন্যে শোকরের কারণ। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)যখন পাপীরা পুনরায় দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা করবে এবং আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলী অবিশ্বাস করার কারণে আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করবে এবং তাঁর রসূলদের আনুগত্য না করার কারণে দুঃখে ফেটে পড়বে তখন মহান আল্লাহ বলবেনঃ প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, আমার নিদর্শন তোমাদের নিকট এসেছিল, কিন্তু তোমরা ওগুলোকে মিথ্যা বলেছিলে ও অহংকার করেছিলে এবং তোমরা তো কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত। এখন তোমাদের এই দুঃখ, লজ্জা ও অনুতাপ বৃথা। এসব করে এখন আর কোনই লাভ হবে না। (তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)

নোট: উপরোক্ত আয়াতসমুহ ও তার ব্যাখ্যা থেকে পাঠক অনুধাবন করতে পারেন কুরআনের চর্চা ও অব্যাহত তেলাওয়াত (যার আভিধানিক অর্থ পাঠ করা, অনুসরন করা) মানব জীবনে শুভ পরিণাম লাভে কত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ক্ষণস্থায়ী জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য লাভের আশায় অধিকাংশ মানুষ কুরআনকে উপেক্ষা করে নিজেরা এবং তাদের সন্তানদেরকে মনকে মন টনকে টন জাগতিক বিষয়ের গ্রন্থ অধ্যয়নে প্রভূত সময়, শক্তি ও অর্থ ব্যয় করে চলেছে। জাতীয় নেতৃত্ব ও শিক্ষার সর্বস্তরে তার আবশ্যিক অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেন নাই।

➧ যারা অবিশ্বাস করে, তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি এবং যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। কাকেও যদি তার মন্দ কাজ শোভন করে দেখানো হয় এবং সে একে উত্তম মনে করে, সে ব্যক্তি কি তার সমান (যে সৎকাজ করে)? আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। অতএব তুমি ওদের জন্য আক্ষেপ করে নিজেকে ধ্বংস করো না। নিশ্চয় ওরা যা করে, আল্লাহ তা খুব জানেন। (সূরা ফাতির, আয়াত নং ৭-৮)

ব্যাখ্যা: এখানেও আল্লাহ তাআলা অন্য স্থানের মত ঈমানের সাথে নেক আমলের কথা উল্লেখ করে তার গুরুত্বকে পরিষ্ফুটিত করে দিয়েছেন; যাতে মু'মিনগণ নেক আমল থেকে কোন সময় অমনোযোগী না হয়, যেহেতু ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি সেই ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত, যার সাথে নেক আমল থাকবে।

আল্লাহ তাআলা নিজ ইনসাফ, ন্যায়পরায়ণতা ও নিয়ম-নীতি অনুযায়ী ঐ ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট করেন, যে নিরন্তরভাবে আপন কর্ম দ্বারা নিজেকে তার উপযুক্ত বানিয়ে নেয়। পক্ষান্তরে নিজ দয়া ও অনুগ্রহে ঐ ব্যক্তিকে সৎপথ প্রদর্শন করেন, যে সৎপথ অন্বেষণকারী হয়।

অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে তাদের কোন কথা বা কর্ম গুপ্ত নয়। উদ্দেশ্য হল, তাদের সাথে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারটা একজন সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত এবং একজন বিজ্ঞের মত। সাধারণ এমন বাদশাদের মত নয়, যারা নিজের স্বাধীনতাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করে, কখনো সালাম পাওয়ার পরেও অসন্তুষ্ট হয়, আবার কখনো কটুবাক্যের বদলে উপঢৌকন দিয়ে থাকে। (তাফসীর আহসানুল বায়ান, সংক্ষেপিত)

➧ কিন্তু যারা তাওবাহ্ করে, নিজেদেরকে সংশোধন করে, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাদের দ্বীনকে একনিষ্ট করে (কোনরূপ রিয়া তথা লোক দেখানো ও শোনানোর লেশমাত্র উদ্দেশ্য যার মধ্যে নেই), তারা মুমিনদের সঙ্গে থাকবে এবং মুমিনদেরকে আল্লাহ অবশ্যই মহাপুরস্কার দেবেন। তোমরা যদি শোকর-গুজার* হও এবং ঈমান আন, তবে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কি করবেন? আর আল্লাহ (শোকরের) পুরস্কার দাতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৪৬-১৪৭)

ব্যাখ্যা: আয়াতে শোকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর আসল অর্থ হচ্ছে নেয়ামতের স্বীকৃতি দেয়া ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং অনুগৃহীত হওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অনুগ্রহকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি কি? হৃদয়ের সমগ্র অনুভূতি দিয়ে তার অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়া, মুখে এ অনুভূতির স্বীকারোক্তি করা এবং কার্যকলাপের মাধ্যমে অনুগৃহীত হওয়ার প্রমাণ পেশ করাই হচ্ছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক উপায়। এ তিনটি কাজের সমবেত রূপই হচ্ছে শোকর। এ শোকরের দাবী হচ্ছে প্রথমতঃ অনুগ্রহকে অনুগ্রহকারীর অবদান বলে স্বীকার করা। অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে অনুগ্রহকারীর সাথে আর কাউকে অংশীদার না করা। দ্বিতীয়তঃ অনুগ্রহকারীর প্রতি ভালবাসা, বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের অনুভূতি নিজের হৃদয়ে ভরপুর থাকা এবং অনুগ্রহকারীর বিরোধীদের প্রতি এ প্রসঙ্গে বিন্দুমাত্র ভালবাসা, আন্তরিকতা, আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার সম্পর্ক না থাকা। তৃতীয়তঃ অনুগ্রহকারীর আনুগত্য করা, তার হুকুম মেনে চলা, তার নেয়ামতগুলোকে তার মর্জির বাইরে ব্যবহার না করা। (তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

মুনাফিকদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি এই চারটি কর্মের প্রতি ঐকান্তিকতার সাথে যত্নবান হবে, সে জাহান্নামে যাওয়ার পরিবর্তে ঈমানদারদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা করার অর্থ হল, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী অন্যায়-অনাচার থেকে বিরত থাকা এবং নেক আমলের প্রতি যত্ন নেওয়া। এটাই হল আল্লাহর নিয়ামতের কার্যতঃ কৃতজ্ঞতা। আর ঈমান (বিশ্বাস) বলতে আল্লাহর তাওহীদ (একত্ব), তাঁর রবূবিয়্যাত (প্রতিপালকত্ব) এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) -এর রিসালাত এবং অন্যান্য দ্বীনী বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। (তাফসীর আহসানুল বয়ান)