উপরে আমরা মূল অনুবাদে দেখেছি যে শিরকের মুলোচ্ছেদ করে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই পৃথিবীতে আল্লাহ নবী রসূলদের পাঠিয়েছেন। অতঃপর ইসলামের কেন্দ্র বা ভিত্তিমূল ৩ প্রকারের তাওহীদের সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সঠিক পরিচয় পেশ করা হয়েছে।

এরপরে তাওহীদ ও রেসালাতের মৌলবাণী লা’ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার ৪ দফা অঙ্গীকারনামায় আবদ্ধ হয়ে মুসলিম হিসেবে ইসলামে দীক্ষিত হবার পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর কালেমায় তাইয়েবার ফযিলত সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীসের ব্যাখ্যাসহ (প্রযোজ্যক্ষেত্রে) জান্নাত লাভের শর্ত হিসেবে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপসমূহ বর্জনের উপরও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে যাতে ঈমানের সাথে আমলকারী ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে আত্নরক্ষা করতে পারেন। বিশেষভাবে ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়সমুহ যথা কুফর, নিফাক ও শিরকের আলোচনা করা হয়েছে। এসব বিষয়ের জ্ঞানার্জন সচেতনভাবে তাওহীদের জ্ঞানসহ ঈমান আনার মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ গুরুত্বের কারনে মুনাফিকদের চরিত্র ও বৈশিষ্ঠের কথা মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবের বহু সংখ্যক আয়াতে এবং নাবী (ﷺ) বহু হাদীসে বর্ননা দিয়ে তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন যাতে মুমিনরা তাদের সমূহ ক্ষতি থেকে আত্নরক্ষা করতে পারে। উল্লেখ্য, মুনাফিকরা মুসলিম সমাজের মাঝেই বাস করে এবং তাদের সৃষ্ট ফিতনার কারনে মুমিন মুসলমানরা দুঃখ, কষ্ট ও বহু ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সেকারনে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামের উপরোক্ত জ্ঞানের অভাবে আমাদের স্নেহের সন্তান ও স্বজনরা ইজাগতিক বিষয়ে টনকে টন বই-পত্র অধ্যয়ন ও বহু ডিগ্রী পদবী অর্জন করেও পাক্কা মুনাফিক হতে পারে। তারা জামার আস্তিনে বিষধর সাপ অথবা সিনেমার ভিলেনের মত ভয়ঙ্কর হতে পারে। উল্লেখ্য, মুনাফিকরা সমাজের সবচেয়ে খারাপ মানুষ। যেকারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে শাস্তি দিবেন।

সুতরাং প্রতিটি পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে, ওয়াজ-মাহফিল ও জুমা’র খুতবায় এই বিষয়ের ব্যাপক আলোচনা, প্রচার ও শিক্ষাদান মানব সমাজে যুদ্ধ-বিগ্রহ, কলহ বিবাদ, সংঘর্ষ-হানাহানি, হত্যাকান্ড সংঘটন বা সেরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি ও লক্ষ লক্ষ মামলা মোকদ্দমা দূর করতে এবং বহু কাঙ্খিত শান্তি প্রতিষ্ঠায় একান্ত সহায়ক হবে ইনশা’আল্লাহ্।

এই পুস্তিকায় আলোচিত অতীব গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও বিষয়বস্তুর প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য সম্মানিত পাঠক, বিশেষ করে সম্মানিত ঈমাম, শিক্ষক ও মুবাল্লিগগণের প্রতি ঐকান্তিক অনুরোধ রইলো। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, দ্বীনী শিক্ষায় পিএইডি ডিগ্রিধারী ও ১৮টি গ্রন্থপ্রনেতা ড. মুহাম্মাদ খলিলুর রহমান মাদানী তার লিখিত “আল্লাহ এক” বইয়ের ভূমিকায় আফসোসের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ইলমুল আকাইদ, ইলমুল কালাম ইত্যাদি বিষয় থাকার পরেও তাওহীদের সঠিক ধারনা পাওয়ার সুযোগ কম। এমতাবস্থায় ১৯৯১ সালে (ঢাকা তামীরুল মিল্লাত মাদ্রাসা থেকে প্রথম শ্রেণীতে কামিল পাসের পর) মদিনা মুনাওয়ারাহ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবার আগ পর্যন্ত তিনি এ সম্পর্কে অনেকটা অন্ধকারে ছিলেন। আশাকরি এ থেকে পাঠক ভাইবোনেরা উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী আকীদাহ বিভাগের অধ্যাপকের লেখা থেকে অত্র অনুবাদ ও তার সংযোজন বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন। জীবন সায়াহ্নে উক্ত বিষয়ের একজন পাঠক ও অনুবাদক হতে পেরে নিজেকে কৃতার্থ মনে করছি। এতদসঙ্গে আমার হৃদয়ের ঐকান্তিক আকাঙ্খা ছোট এই পুস্তকাটি আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের কল্যানে সবরকম শিক্ষার প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত জাতীয় পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোন মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না, অথচ অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের শিক্ষাপ্রদান ও প্রচার করা হতো এবং নিজেদের শিক্ষার পাশাপাশি আল্লাহ্‌র পথে আহ্বানকারীর দায়িত্ব ও মুসলমানরা পালন করতো। আর আমাদের নিকট উভয় পদ্ধতিতে শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভের সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে।

আল্লাহ্‌ কর্তৃক ‘কাকের’ দাফন দৃশ্য দেখানোর আগে পর্যন্ত কাবিল তারই হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত আপন ভাই হাবিলকে কবরস্থ করার দিশা/হুঁশ পায়নি। যে কারণে সে নিজেকে ধীক্কার দিয়েছে। তদ্রুপ আমাদের সন্তানদের পথপ্রদর্শণ না করলে তারা কিভাবে হেদায়াত লাভ করবে? জ্ঞানলাভের পরেও যারা তা অমান্য করে আল্লাহ্‌র ক্রোধভাজন (মাগদুবে আলাইহিম) হবে, তাদের কথা আলাদা। নবীদের ঘরেও কাফের সন্তান ও স্ত্রীর দৃষ্টান্ত কুরআনের বর্ণনায় এসেছে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, ক্বিয়ামাতের দিন সর্বপ্রথম আদাম (আঃ)-কে ডাকা হবে। তিনি তাঁর সন্তানদের দেখতে পাবেন। তখন তাদেরকে বলা হবে, ইনি তোমাদের পিতা আদাম (আঃ) । তখন তারা বলবে, আমরা তোমার খিদমাতে হাযির! এরপর তাঁকে আল্লাহ্ বলবেন, তোমার জাহান্নামী বংশধরকে বের কর। তখন আদাম (আঃ) বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! কী পরিমাণ বের করব? আল্লাহ্ বলবেনঃ প্রতি একশ’তে নিরানব্বইজনকে বের কর। তখন সহাবাগণ বলে উঠলেন, হে আল্লাহ্‌র রসূল (ﷺ)! প্রতি একশ থেকে নিরানব্বইজনকে বের করা হবে তখন আর আমাদের কে বা কী থাকবে? তিনি (ﷺ) বললেনঃ নিশ্চয়ই অন্যান্য সকল উম্মাতের তুলনায় আমার উম্মাত হল কাল ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা চুলের মত। (বুখারী ৬৫২৯, আধুনিক প্রকাশনী-৬০৭৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৬০৮৫)

উল্লেখ্য, পরবর্তীতে শাফায়াত বা সুপারিশের মাধ্যমে অগণিত মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হবে। তবুও এটা মানবজাতির এমনকি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যও একটি ভয়াবহ দুঃসংবাদ বা উদ্বেগের কারণ। অবশ্য অন্যান্য নবীর উম্মতের তুলনায় তাদের সংখ্যা কালো ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা চুলের মতো বলে নবীজী (ﷺ) আশ্বস্ত করেছেন।

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে। উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে। তারা পরবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং বসবে মুখোমুখি হয়ে। এরূপই ঘটবে; আর আমরা তাদেরকে বিয়ে দিয়ে দেব ডাগর নয়না হূরদের সাথে। সেখানে তারা প্রশান্ত চিত্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে। প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেখানে আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন। আপনার রবের অনুগ্রহস্বরূপ। এটাই তো মহাসাফল্য।” (সূরা আদ-দুখান, আয়াত নং ৫১-৫৭)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতবাসীদের বলে দেয়া হবে, তোমরা এখানে চিরদিন সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না, চিরদিন জীবিত থাকবে, কখনো মরবে না চিরদিন সুখী থাকবে কখনো দুর্দশাগ্রস্ত হবে না এবং চিরদিন যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। [মুসলিম: ২৮৩৭]

“জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেবলমাত্র কেয়ামতের দিনই তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেয়া হবে। অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছু নয়।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ১৮৫)

পার্থিব জীবনে মানুষ সফলতার নানা মানদন্ড নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু প্রকৃত সফলতা কি তা উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে পার্থিব জীবনের ধোকার জালে যে ফেঁসে যাবে, সেই হবে প্রকৃত ব্যর্থ ও হতভাগা।

উপরোক্ত আয়াতসমূহের শিক্ষার আলোকে জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামতের বর্ণনা পুনঃপুনঃ পাঠ/আলোচনা (বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠসহ) জান্নাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস অর্জনে এবং জান্নাত লাভের জন্য সৎকর্ম করতে মানুষকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে। তৎসঙ্গে জাহান্নামের ভয়াবহ বর্ননার পুনঃপুনঃ চর্চা তা থেকে আত্মরক্ষা করতে তথা মহাপাপে লিপ্ত হওয়া থেকে মানুষকে বিরত রাখবে যা আল্লাহভীরু বান্দার বৈশিষ্ট্য। আর জান্নাত লাভ করবে আল্লাহভীরু বান্দারা। মহান আল্লাহ বলেনঃ এ সে জান্নাত, যার অধিকারী করব আমরা আমাদের বান্দাদের মধ্যে মুত্তাকীদেরকে (যারা আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ ও অপছন্দনীয় কর্ম সমুহ থেকে বিরত থাকে এবং আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট ও পছন্দনীয় সৎকর্মসমুহ সম্পাদন করে) । (সূরা মারিয়াম, আয়াত নং ৬৩)

আর যারা তাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। (সূরা যুমার, আয়াত নং ৭৩

যে কোন সফলতার পিছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি। যে ছাত্র ভালো প্রস্তুতি গ্রহণ করে, সে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাঞ্ছিত সুফলই পেয়ে থাকে। কিন্তু যার প্রস্তুতিই থাকেনা এবং ভালো কিছু লাভের ব্যাপারে উদাসীন, সে পরীক্ষায় পাশ করার এমনকি গ্রেস মার্ক নিয়েও পাশের আশা করেনা। এটাই বাস্তবতা।

উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত প্রকৃত সফলকাম ব্যক্তিদের দলে শামিল হতে জ্ঞান অন্বেষনকারী ভাই ও বোনদের প্রতি আমি এই প্রত্যাশা করি তারা যেন তাদের সন্তান, ভাই, বোন ও স্বজনদের প্রতি সদয় হন এবং অনুগ্রহ করে এই পুস্তিকায় বর্ণিত সংক্ষিপ্ত জ্ঞানের বিষয়বস্তু তাদের অবহিত করার ত্যাগ স্বীকার করেন। এটা সর্বোত্তম কল্যাণকর জনসেবা, সমাজ সংস্কারের কাজ ও সদকায়ে জারিয়া –যা ব্যক্তির শুভ পরিণাম লাভে অতীব সহায়ক আমল হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে, ইনশা’আল্লাহ্‌।

‏”‏ سُبْحَانَك َاللَّهُم َّوَبِحَمْدِك َأَشْهَد ُأَن ْلا َإِلَه َإِلا َّأَنْت َأَسْتَغْفِرُك َوَأَتُوب ُإِلَيْكَ‏“

সমাপ্ত