দুনিয়াতে যথা নিয়মে ও যথা সময়ে তওবা করলে মহাক্ষমাশীল আল্লাহ সমস্ত গুনাহকে ক্ষমা করে দেন। ছোট গুনাহ নানা নেক আমলের কারণে মাফ হয়ে যায়। কাবীরা গুনাহ করে তাওহীদবাদী মুসলিম তওবা না করে মারা গেলে কিয়ামতে আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। মহান আল্লাহ চাইলে তাওহীদের গুণে তাকে ক্ষমা করে বেহেশতে দেবেন। আর না চাইলে দোযখে সাজা ভুগিয়ে এক দিন না এক দিন বেহেশতে দেবেন। কিন্তু অতি মহাপাপ, যা আল্লাহ কিয়ামতে ক্ষমা করবেন না এবং কোনোদিনও ক্ষমা করবেন না, এমন পাপীরা চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে। যেহেতু আসলে তারা মহান আল্লাহর শত্রু।

১. কুফরী: কুফরী মানে অবিশ্বাস, অস্বীকার, অমান্য, সন্দেহ, মিথ্যায়ন, প্রত্যাখ্যান, ঘৃণা, অকৃতজ্ঞতা ইত্যাদি। তার সাথে যোগ হতে পারে অত্যাচার, আল্লাহর পথে মানুষকে বাধা দান ইত্যাদি। এমন কাফের ব্যক্তি তওবা করে ঈমান আনয়ন না করে মারা গেলে কিয়ামতে কম্মিনকালেও ক্ষমা পাবে না। বিধায় তারাও অনন্তকালের জন্য দোজখবাসী হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,
➧ “যারা অবিশ্বাস করে ও আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে, অতঃপর অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না।” (সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত নং ৩৪)

➧ “যারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করে এবং আবার বিশ্বাস করে, অতঃপর আবার অবিশ্বাস করে, অতঃপর তাদের অবিশ্বাস প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোন পথও দেখাবেন না।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৩৭)

➧ “নিশ্চয় যারা অবিশ্বাস করেছে ও অত্যাচার করেছে, আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেন না এবং কোন পথও দেখাবেন না ; জাহান্নামের পথ ছাড়া। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এ তো আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৬৮-১৬৯)

➧ “আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য আছে জাহান্নামের আগুন। তাদের উপর ফায়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মরবে এবং তাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমরা প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে শাস্তি দিয়ে থাকি।” (সূরা ফাতির, আয়াত নং ৩৬)

২. মুনাফিকী (যা বড় কুফুরীর একটি শাখা): মুখে ইসলাম বুকে কুফরী রেখে যারা মুসলিম সমাজে বসবাস করে, তাদেরকেও মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। দুনিয়াতে নবীর ক্ষমা প্রার্থনাতেও তারা ক্ষমা পায় নি। নিজে তওবা করে না মারা গেলে কিয়ামতেও ক্ষমা পাবে না তারা। মহান আল্লাহ বলেছেন-

➧ “তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো অথবা না করো (উভয়ই সমান); যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বার ক্ষমা প্রার্থনা করো, তবু আল্লাহ তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না; যেহেতু তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে। আর আল্লাহ অবাধ্য সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা তাওবাহ, আয়াত নং ৮০)

৩. শির্ক: আল্লাহর সাথে শির্ক করা একটি অতি মহাপাপ। তওবা করে মারা না গেলে কিয়ামতে তিনি মুশরিককে ক্ষমা করবেন না। তিনি বলেছেন,

➧ “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শির্ক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শির্ক) করে, সে এক মহাপাপ করে।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ৪৮)

নোট: মুশরিক ক্ষমা পাবে না মানেই সে চিরকালের জন্য জাহান্নামী থাকবে। মহান আল্লাহ বলেছেন,

➧ “অবশ্যই যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ করবেন ও দোজখ তার বাসস্থান হবে এবং অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ, আয়াত নং ৭২)

৪. নরহত্যা: নরহত্যা একটি অতি মহাপাপ। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম।

➧ আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন। (সূরা নিসা, আয়াত নং ৯৩)

ব্যাখ্যা: ‘আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, যখন সূরা আল-ফুরকানের এ আয়াত নাযিল হলো “আর তারা আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না। আল্লাহ্ হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করেনা এবং ব্যভিচার করেনা। যে এগুলো করে, সে শাস্তি ভোগ করবে।” (আয়াত: ৬৮] তখন মক্কার মুশরিকরা বলতে লাগল, আমরাতো আল্লাহর হারাম করা আত্মাকে হত্যা করেছি, আল্লাহর সাথে অন্যান্য ইলাহকেও ডেকেছি এবং ব্যভিচারও করেছি। ফলে আল্লাহ তা'আলা নাযিল করলেন “তারা নয়, যারা তাওবা করে, ঈমান আনে” সুতরাং এই আয়াতটুকু ঐসমস্ত লোকদের জন্য যাদের কথা পূর্বে এসেছে। কিন্তু সূরা আন-নিসার আয়াত “কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা'নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” এখানে ঐ লোককে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যে ইসলামকে ভালোভাবে জানল, শরী'আতকে বুঝল, তারপর কোনো মুমিনকে হত্যা করল-তার শাস্তি হবে জাহান্নাম। (বুখারী ৩৮৫৫, ৪৭৬৪-৪৭৬৬; মুসলিম ৩০২৩’। আব্দুল্লাহ্ ইবন আব্বাস রাঃ আরও বলেন, এটি সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। একে কোনো কিছু রহিত করেনি। (বুখারী ৪৫৯০, মুসলিম ৩০২৩] এতে বুঝা যায় যে, ‘আব্দুল্লাহ্ ইবন আব্বাস রাঃ এর মত হলো, যদি কেউ কোনো মুমিনকে জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত হত্যা করে, তবে তার শাস্তি জাহান্নাম অবধারিত। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাঃ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, একজন মুমিন ব্যক্তি তার দীনের ব্যাপারে মুক্তির সুযোগের মধ্যে থাকে যতক্ষণ সে কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে হত্যা না করে। [বুখারী ৬৮৬২] অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা মুমিনের হত্যাকারীর জন্য তাওবাহ কবুল করতে আমার নিকট অস্বীকার করেছেন। [আল-আহাদীসুল মুখতারাহ ৬/১৬৩, নং-২১৬৪] অন্য হাদীসে এসেছে, আবূ বাকরাহ রাঃ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যখন দু’মুসলিম তাদের অস্ত্র নিয়ে একে অপরের মুখোমুখি হয় তখন হত্যাকারী ব্যক্তি ও হত্যাকৃত ব্যক্তি উভয়ই জাহান্নামী | আবু বাকরাহ বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রসূল! হত্যাকারীর ব্যাপারটাতো স্পষ্ট, কিন্তু হত্যাকৃত ব্যক্তির কী অপরাধ? তিনি জবাব দিলেন যে, সে তার সাথীকে হত্যা করার লালস করছিল। (বুখারী ৬৮৭৫, মুসলিম ২৮৮৮)

হাদীসে আরো এসেছে যে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কেয়ামতের দিন প্রথম বিচার অনুষ্ঠিত হবে মানুষের রক্তক্ষরণ তথা হত্যার ব্যাপারে। (বুখারী ৬৮৬৪, মুসলিম ১৬৭৮) (তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)

এতে মানুষের অধিকার রয়েছে বলে তাওবা দ্বারা এ পাপ ক্ষমা হতে পারে না। বরং মানুষের হক তো তাওবার অবস্থাতেও হকদারকে পৌছিয়ে দিতে হবে। এতে যেমন হত্যা রয়েছে তদ্রুপ চুরি, জবরদখল, অপবাদ এবং অনান্য হককুল ইবাদও রয়েছে। এগুলো তাওবা দ্বারা ক্ষমা না হওয়া ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। এ অবস্থায় তাওবার বিশুদ্ধতার জন্যে শর্ত হলো প্রাপকদের প্রাপ্যগুলো আদায় করে দেয়া। আর আদায় করা যখন অসম্ভব তখন কিয়ামতের দিন দাবীদারগণ দাবী অবশ্যই করবে। কিন্তু দাবী করলেই যে শাস্তি ঘটেই যাবে এটা জরুরী নয়। এও সম্ভব যে, হত্যাকারীর সমস্ত ভাল কাজের পুণ্য নিহত ব্যক্তিকে দেয়া হবে বা আংশিক পূণ্য দেয়া হবে এবং তাকে দেয়ার পরেও হয়তো হত্যাকারীর নিকট কিছু পূণ্য থেকেও যাবে, আর ওর বিনিময়ে হয়তো আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আবার এটাও অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পক্ষ হতে নিহত ব্যক্তিকে হুর, প্রাসাদ, উচ্চ মর্যাদা এবং জান্নাত দিয়ে তার দাবী পূরণ করবেন এবং ওরই বিনিময়ে হয়তো সে তার হন্তাকে খুশী মনে ক্ষমা করে দেবে, ফলে আল্লাহ তাআলাও তাকে মাফ করবেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে ভাল জানেন। সুত্রঃ তাফসীর ইবনে কাছীর (সূরা নিসা (ﷺ) ৯৩, সংক্ষেপিত)

➧ আল্লাহর রসূল (বানীবাহক, সংবাদবাহক, দূত) (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে হত্যা করে তা নিয়ে আনন্দ উপভোগ করবে সে ব্যক্তির নফল, ফরয কোন ইবাদতই আল্লাহ কবুল করবেন না। আবু দাউদ হা/৪২৭২, সহীহুল জামে’ হা/৬৪৫৪

➧ নবী (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন (মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী) যিম্মী (অথবা সন্ধিচুক্তির পর বিপক্ষের কাউকে) হত্যা করবে সে ব্যক্তি জান্নাতের সুবাসও পাবে না। অথচ তার সুবাস ৪০ বছরে অতিক্রম্য দূরবর্তী স্থান হতে পাওয়া যাবে। -বুখারী ৩১৬৬, ৬৯১৪, ইবনে মাজাহ ২৬৮৬

➧ আসমান ও দুনিয়াবাসী যদি কোন মু’মিনকে হত্যায় শরীক হয় তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাদের সকলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। -তিরমিযী ১৩৯৮, মিশকাত ৩৪৬৪, সিহীহুল জামে’ ৫২৪৭

৫. পাপ প্রকাশ করা: অনেকে ধৃষ্টতার সাথে পাপ করে, নির্লজ্জতার সাথে পাপ প্রদর্শন করে, জনসমক্ষে পাপ করে, বুকের পাটা দেখিয়ে পাপ করে দাপিয়ে বেড়ায়। অনেক সময় পাপ গোপনে করে পরে তা প্রকাশ করে বেড়ায়। এমন পাপীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মহানবী (ﷺ) বলেছেন-

➧ “আমার প্রত্যেক উম্মতের পাপ মাফ করে দেওয়া হবে, তবে যে প্রকাশ্যে পাপ করে (অথবা পাপ করে বলে বেড়ায়) তার পাপ মাফ করা হবে না। আর পাপ প্রকাশ করার এক ধরণ এও যে, একজন লোক রাত্রে কোন পাপ করে ফেলে, অতঃপর আল্লাহ তা গোপন করে নেন। (অর্থাৎ কেউ তা জানতে পারে না।) কিন্তু সকাল বেলায় উঠে সে লোকের কাছে বলে বেড়ায়, 'হে অমুক! গত রাতে আমি এই এই কাজ করেছি '। রাতের বেলায় আল্লাহ তার পাপকে গোপন রেখে দেন; কিন্তু সে সকাল বেলায় আল্লাহর সে গোপনীয়তাকে নিজেই ফাঁস করে ফেলে।” বুখারী তাও. হা/৬০৬৯, মুসলিম হা/৭৬৭৬

৬. ঋণ পরিশোধ না করা:

➧ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “ঋণ পরিশোধ না করার পাপ ছাড়া শহীদের সমস্ত পাপকে মাফ করে দেওয়া হবে।” মুসলিম হা/৪৯৯১, মিশকাত হা/২৯১২

➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, সুবহানাল্লাহ! ঋণের ব্যাপারে কি কঠিনতাই না অবতীর্ণ হয়েছে! সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদে মৃত্যুবরন করে, অতঃপর জীবিত হয়ে পুনরায় জিহাদে মৃত্যুবরন করে, অতঃপর আবার জীবিত হয়ে আবারও শহীদ হয়, আর সে ঋণগ্রস্ত হয় – তাহলে ঐ ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সে জান্নাতে প্রবেশাধিকার লাভ করতে সক্ষম হবে না। আহমাদ হা/২২৪৯৩, নাসাঈ হা/৪৬৮৪, হাকেম হা/২২১২, বাইহাকী হা/১১২৮২, সহীহুল জামে’ হা/৩৬০০

➧ হুযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন আল্লাহ্‌ তা'আলা আমার অন্তরে ইসলাম গ্রহণের মানসিকতা সৃষ্টি করে দিলেন, তখন আমি রসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) এর খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলাম, আপনার ডান হাতটি বাড়িয়ে দিন, আমি আপনার হাতে ইসলাম গ্রহণ করব। তিনি তখন নিজের ডান হাতটি বাড়িয়ে দিলেন; কিন্তু আমি হাত ফিরিয়ে নিলাম। হুযূর (ﷺ) বললেন, “হে আমর! তোমার কি হল? (অর্থাৎ, তুমি তোমার হাত কেন ফিরিয়ে নিলে?)” আমি নিবেদন করলাম, আমি একটি শর্ত লাগাতে চাইতিনি বললেন, “তুমি কি শর্ত আরোপ করতে চাও?” আমি আরয করলাম, আমাকে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়তখন তিনি বললেন, “হে আমর! তোমার কি একথা জানা নেই যে, ইসলাম গ্রহণ পূর্ববর্তী সকল গুনাহ্‌কে ধ্বংস করে দেয়, হিজরতও পূর্ববর্তী গুনাহ্‌সমূহকে শেষ করে দেয় এবং হজ্জও পূর্ববর্তী গুনাহ্‌সমূহকে দূর করে দেয়।” (মুসলিম শরীফ, মা’আরিফুল হাদীস ১ম খন্ড হা/২০)

ব্যাখ্যা: হুযূর (ﷺ) গুনাহ্‌মাফীর ক্ষেত্রে ইসলাম ছাড়া হিজরত এবং হজ্জের প্রভাবের কথা এই স্থানে এ বিষয়টি প্রকাশ করার জন্য বলেছেন যে, ইসলাম তো ইসলামই; এর কোন কোন আমলের মধ্যেও গুনাহ্‌ থেকে পবিত্র করে দেওয়ার শক্তি রয়েছে। তবে এখানে দু'টি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়ঃ (১) ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরত অথবা হজ্জ করার এই প্রভাব ঐ অবস্থায় প্রতিফলিত হবে, যখন এ কাজগুলো খাঁটি

নিয়্যতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করা হবে(২) শরী'অতের দলীল-প্রমাণ দ্বারা এ কথা স্বস্থানে স্বীকৃত যে, কারো জিম্মায় যদি আল্লাহর বান্দাদের কোন হক থাকে, বিশেষ করে অর্থ সংক্রান্ত হক থাকে, তাহলে ইসলাম গ্রহণ অথবা হিজরত কিংবা হজ্জের দ্বারা এ হক মাফ হবে নাএ ব্যাপারটি পাওনাদারদের নিকট থেকে পরিস্কার করে নিতে হবে

৭. উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করা:

➧ “আর কেউ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হলে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লংঘন করলে তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৪)

ব্যাখ্যা: অর্থাৎ আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা তথা ওয়ারিশী নীতির ব্যাপারে যে বিধান দেয়া হয়েছে তা লঙ্ঘন করবে তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। কেননা সে আল্লাহর হুকুমকে পরিবর্তন করেছে, আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা করেছে। তখনই কেউ এরূপ করতে পারে যখন সে আল্লাহর নির্দেশের উপর অসন্তুষ্ট থাকে। এজন্য আল্লাহ তাকে চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা দ্বারা শাস্তি দিবেন। সুত্রঃ তাফসীর আবু বকর জাকারিয়া (সংক্ষেপিত)

৮. সুদ হারাম জানার পরেও তা খাওয়া:

➧ “যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, ক্রয়-বিক্রয় তো সূদেরই মত। অথচ আল্লাহ্‌ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সূদকে হারাম করেছেন। অতএব, যার নিকট তার রব-এর পক্ষ হতে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহ্‌র ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত নং ২৭৫)

➧ “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যা বকেয়া আছে তা বর্জন কর; যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। অতঃপর যদি তোমরা না কর তবে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও। আর যদি তোমরা তাওবা কর তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা যুলুম করবে না এবং তোমাদের উপরও যুলুম করা হবে না। (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত নং ২৭৮-২৭৯)

ব্যাখ্যা: কুফর ছাড়া অন্য কোন বৃহত্তম গোনাহর কারণে কুরআনুল কারীমে এত বড় শাস্তির কথা আর উচ্চারিত হয়নি। (মা'আরিফুল কুরআন)

সুদের সংজ্ঞা: রিবা শব্দের অর্থ সুদ। রিবা আরবী ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। রিবা দু'প্রকারঃ একটি ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে। আর অপরটি ক্রয়-বিক্রয় ছাড়া। প্রথম প্রকার রিবা সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, অমুক অমুক বস্তুর ক্রয়-বিক্রয়ে কম-বেশী করা রিবার অন্তর্ভুক্ত। এ প্রকার রিবাকে রিবা ফাদল বলা হয়। আর দ্বিতীয় প্রকার রিবাকে বলা হয়, রিবা-আন-নাসিয়্যাহ। এটি জাহেলিয়াত যুগে প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত ছিল। সে যুগের লোকেরা এরূপ লেন-দেন করত। এর সংজ্ঞা হচ্ছে, ঋণে মেয়াদের হিসাবে কোন মুনাফা নেয়া। যাবতীয় রিবাই হারাম। সূত্রঃ তাফসীর আবু বকর জাকারিয়া

নোট: প্রাসঙ্গিক, সূদী লেন-দেনে (রিবা নাসিয়্যাহ) অর্থকে পণ্য হিসেবে গণ্য করে খাটানো হয় এবং সময়ের মেয়াদে ঋণের উপর অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় যা সূদ এবং মানুষকে আর্থিকভাবে শোষণের প্রধান হাতিয়ার। পক্ষান্তরে ইসলামী শরীয়া ভিত্তিক লেন-দেনে পণ্য দ্রব্যের ব্যবসা, শিল্প কারখানা, পরিবহণ, উৎপাদন, নির্মাণসহ বিবিধ খাতে শরীয়া সম্মত চুক্তির ভিত্তিতে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। এই প্রকার বিনিয়োগের মাধ্যমে পণ্য বিপণন, পরিবেশন ও তার উৎপাদনের সাথে জড়িত কাজে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয় -যে কারণে তা বৈধ। কিন্তু কোন ব্যবসায়ী/গ্রাহক যদি উক্ত চুক্তি (যা পালন করা তার জন্য ফরজ কর্তব্য) ভঙ্গ করে মালামাল ক্রয় না করে তবে সে সূদী কারবারে জড়িয়ে পড়বে এবং তার দায়ভার প্রধানত তার উপরই বর্তাবে।

➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘অবশ্যই মানুষের কাছে এমন এক যুগ আসবে তারা মসজিদ গুলোতে একত্রিত হবে এবং সালাত আদায় করবে কিন্তু তাদের মধ্যে একজনও মুমিন নেই অথচ বহু মানুষ সেখানে সালাত আদায় করছে।’ রসূল (ﷺ) এর এই কথা শুনে সাহাবীরা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোন সময়ে এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি আসবে হে আল্লাহর রসূল (ﷺ)! তখন রসূল (ﷺ) বললেন, ‘যখন ওই মুসল্লিরা সুদ খাবে এবং সুউচ্চ অট্টালিকা (বহুতল বাড়ি ও শপিংমল) নির্মাণ করবে।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হা/৪০, সহীহ)

➧ মেরাজের রাতে আমি এক শ্রেণীর লোকের নিকট পৌঁছলাম যাদের পেট ঘরের ন্যায় বড় এবং উহার ভিতরে বহু সাপ রয়েছে যা বাহির হতে দেখা যায়। আর আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “হে জিবরাইল! ইহারা কোন লোক?” তিনি বললেন, “ইহারা সুদখোর” । (ইবনে মাজাহ, আহমদ, মেশকাত [যয়ীফ])

➧ সামুরা বিন জুন্দুব রাঃ নবী (ﷺ) থেকে (স্বপ্নের ঘটনায়) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তারা উভয়ে (ফেরেশতাগণ) আমাকে প্রশ্ন করলো, (যে দৃশ্যসমুহ আপনাকে দেখানো হয়েছে তার মধ্যে) ঐ ব্যক্তি যাকে আপনি রক্তের নদীতে হাবুডুবু খেতে দেখেছেন, যার মুখে বার বার পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ ব্যক্তি যে দুনিয়াতে সুদ গ্রহন করতো। (বুখারী)

➧ বারা বিন আজেব রাঃ কর্তৃক বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, সুদ (খাওয়ার পাপ হল) ৭২ প্রকার। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাপ হল মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মত (অর্থাৎ সুদ খাওয়ার গোনাহ মায়ের সাথে ব্যভিচার করার চেয়ে ৭২ গুণ বেশি) । আর সবচেয়ে বড় (পাপের) সুদ হল নিজ (মুসলিম) ভাইয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করা। -তাবারানীর আউসাত ৭১৫১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৭৮৭১

➧ নবী (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তিই বেশী বেশী সুদ খাবে, তারই (মালের) শেষ পরিণাম হবে অল্পতা। (হাকেম ২/৩৭, সহীহ ইবনে মাজাহ ১৮৪৮, সহিহুল জামে’ ৫৫১৮)

➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, যখন কোন জনপদে ব্যভিচার ও সুদ প্রকাশ লাভ করে, তখন তার বাসিন্দারা নিজেদের জন্য আল্লাহ তায়ালার কিতাব (আজাব) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত বৈধ করে নেয়। (তাবারানী ৪৬৩, হাকেম ২২৬১, সহিহুল জামে’ ৬৭৯)