প্রখ্যাত দায়ী, গবেষক, হাদীসের অধ্যাপক ও বহুগ্রন্থ প্রনেতা ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহি.) প্রণীত রাহে বেলায়াত গ্রন্থ থেকে উধৃতি:

শুক্‌র অর্থ কৃতজ্ঞতা, রিদা অর্থ সন্তুষ্টি এবং কানা’আত অর্থ অল্পে তুষ্টি। এ তিনটি কর্মে মুমিনের মনকে অনুশীলন করতে হবে। এগুলি দুনিয়া ও আখেরাতের অনন্ত নিয়ামতের উৎস।

আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো তবে আমি আরো বাড়িয়ে দেব আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও তবে আমার শাস্তি বড় কঠিন।” (সূরা ইব্রাহীম, আয়াত নং ৭)

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে অগণিত নিয়ামত রয়েছে আবার অনেক কষ্টও রয়েছে। মানুষের একটি বড় দুর্বলতা আনন্দের কথা তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া কষ্ট বেদনার কথা বারবার স্মরণ করা। এ দুর্বলতা কাটাতে হলে জীবনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই ইতিবাচক হতে হবে। আমরা কখনোই কষ্ট ও অসুবিধাগুলোকে বড় করে দেখবো না। কষ্টের কথা বারবার মনে করে জাবর কাটবো না। বরং আল্লাহর দেয়া নেয়ামত, শান্তি-সুখ বারবার স্মরণ করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবোএ ইতিবাচক ও কৃতজ্ঞতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা মানব জীবনের শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। এ দৃষ্টিভঙ্গি যেকোনো মানুষের জীবনকে শান্তি ও পরিতৃপ্তিতে ভরে দেয়।

কষ্টের অনুভূতিকে ক্রমান্বয়ে কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে রূপান্তরিত করতে হবে। আল্লাহর অগণিত নিয়ামতের মধ্যে কিছু কষ্টের কারণে যদি গুনাহ্‌ ক্ষমা হয় ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় তাহলে অসুবিধা কী? প্রতিটি মানুষের জীবনেই বিপদাপদ আছে। কাজেই আমার জীবনে তো কিছু অসুবিধা থাকবেই। বিপদ ও সমস্যা তো আরো কঠিন হতে পারতো। অনেকের জীবনেই তো আমার চেয়েও অধিক কষ্ট আছেকাজেই আমার হতাশ হওয়ার কিছু নেই

রসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলেছেন, “সম্পদে, শক্তিতে, রিয্‌কে তোমাদের চেয়ে উত্তম কারো দিকে যখন তোমাদের কারো দৃষ্টি পড়বে, তখন যেন সে তার চেয়ে খারাপ অবস্থায় যারা আছে তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করে।” (বুখারী হা/১৩৫৫, মুসলিম হা/২৯৬৩)

অতি সামান্য নিয়ামতেরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস তৈরি করতে হবে। সামান্যতম আনন্দ, তৃপ্তি, ভালো লাগা চারপাশের কারো সামান্যতম সুন্দর আচরণ, সবকিছুর জন্য হৃদয় ভরে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। আল্লাহর সকল নেয়ামতই বড়। ছোট্ট নেয়ামতকে বড় করে অনুভব করলে আল্লাহ্‌ আরও বড় নেয়ামত প্রদান করেন।

রসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “যে ব্যক্তি অল্পের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে বেশিরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” (আহমাদ হা ৪/২৭৮, মাজমাউয যাওয়াঈদ ৫/২১৭)

জীবনের সকল আনন্দ, সুখ, লাভ, পুরস্কার ইত্যাদি সকল নিয়ামতের কথা প্রসঙ্গ ও সুযোগ পেলে অন্যদেরকে বলতে হবে। আমরা সাধারণত সুখের বা আনন্দের কথার চেয়ে দুঃখের কথা বলতে বেশি আগ্রহী। আমাদেরকে এর বিপরীত বলার অভ্যাস আয়ত্ত করতে হবে।

রসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলেন, “আল্লাহর নেয়ামতের কথা বলা কৃতজ্ঞতা এবং তা না বলা অকৃতজ্ঞতা।” (আহমাদ হা ৪/২৭৮, মাজমাউয যাওয়াঈদ ৫/২১৭)

আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার দাবি বান্দার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাযদি কেউ আমাদের সামান্যতম সহযোগিতা করেন, তবে আমাদের দায়িত্ব তার প্রতি পরিপূর্ণ আন্তরিকতার সাথে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাসম্ভব হলে তাকে প্রতিদান দেয়া, না হলে তার জন্য দোয়া করা এবং তার উপকারের কথা অকপটে সকলের কাছে স্বীকার করা ও বলা

রসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ।” (তিরমিযী হা/১৯৫৪)

অন্য হাদীসে তিনি বলেন, “যদি তোমাদের কাউকে কেউ কোন ভাবে উপকার করে, তবে তোমরা তার প্রতিদান দিবেযদি তোমরা প্রতিদান দিতে না পারো, তবে তার জন্য বেশি বেশি দোয়া করবেযাতে অনুভব করতে পারো যে তোমরা তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পেরেছো (হাদীসটি সহীহ্‌, আবু দাঊদ হা ২/২৩১, নাসাঈ হা/৫৮৭) | -এখানে উদ্ধৃতি শেষ।

নোট:

পার্থিব জীবনে কৃতজ্ঞতার শুভ পরিনাম এবং তা অর্জনের উপায়

প্রখ্যাত রোমান রাষ্ট্রনেতা, বাগ্মী ও লেখক সিসেরোর মতে, “কৃতজ্ঞতা শুধুমাত্র শ্রেষ্ঠতম গুণাবলীর অন্যতম নয় বরং তা সকল গুণাবলীর পিতা মাতা।” বহুসংখ্যক গবেষণা অধ্যয়নে দেখা গেছে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বর্ধিত কল্যাণ ও স্বস্তির সম্পর্ক রয়েছে। যা শুধুমাত্র ব্যক্তির ক্ষেত্রে নয় বরং জড়িত সকল ব্যক্তির ক্ষেত্রে। যে কারণে কৃতজ্ঞতা শিক্ষাদান ও এর অনুশীলন পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং মনস্তত্ত্ব শিক্ষার পাঠ্যক্রম এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, পেনসিলভেনিয়া, মিয়ামি এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। কৃতজ্ঞতা মানুষের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও শান্তির সুবাতাস প্রদানের পাশাপাশি দুশ্চিন্তা, উদ্বে্‌গ-পেরেশানী ও দুঃখ-বিপর্যয় দূরীভূত করতে একান্ত সহায়ক-যা গবেষণায় প্রমাণিত। তাছাড়াও কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে সমাজের মানুষের কল্যাণে ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিতে দেখা গেছে। অর্থাৎ তাদেরকে পরার্থবাদী ও সমাজসেবক হতে দেখা যায়। কৃতজ্ঞতা/শোক্‌র অধিকতর সুখ, ইতিবাচক মানসিক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, স্বাস্থ্যন্নোতি, দুঃখ-কষ্ট মোকাবেলা এবং শক্তিশালী সামাজিক সুসম্পর্ক উপভোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃতজ্ঞতা অনুশীলনকারী ব্যক্তিকে বেশি ব্যায়াম করতে এবং কমই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে দেখা গেছে গবেষণায়।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের কয়েকটি পরামর্শ যা ব্যক্তিকে কৃতজ্ঞ বা শোকরগুজার মানুষ হতে সাহায্য করবেঃ

১) কৃতজ্ঞতা অনুশীলনের জন্য যে সব ব্যক্তি, বস্তু বা স্থানের জন্য আপনি কৃতজ্ঞ তার তালিকা তৈরি করা (যেমন- পরিবার, সৃষ্টিশীল কোন কাজ, সুখ, বৃক্ষ, খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি) ।

২) কোন ব্যক্তির এক বা একাধিক অবদান যার আপনি প্রভূত মূল্যায়ন করেন বা উপলব্ধি ও উপভোগ করেছেন তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ/নোট রাখা এবং ঐ ব্যক্তির ডেস্কে, গাড়ীতে বা ব্যাগে তা সেটে দেয়া।

৩) যে সব ব্যক্তি আপনার জন্য বাস্তবেই চমৎকার কিছু করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তাদের কাছে চিঠি লেখা ও উপহার পাঠানো।

৪) প্রতিদিন এজাতীয় ২/৩ টি বিষয় লিখে রাখা এবং সপ্তাহান্তে তার পর্যালোচনা করা যা আপনাকে কৃতজ্ঞ মানুষ হতে স্মরণ করিয়ে দিবে। এবং শিশুসন্তানদেরকে বাবা-মায়ের দান-অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞ হবার শিক্ষা প্রদান করা।

(ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ও পরিমার্জিত)