কালেমা তাইয়্যেবার শাহাদাহ্ ও স্বীকারোক্তির বিবরণ, ফজিলত ও অগ্রাহ্য করার পরিনাম:
কালেমা তাইয়্যেবার শাহাদাহ্ ও স্বীকারোক্তির ক) অংশের ১ম, ২য় ও ৩য় দফা এবং খ) অংশের বিবরণ, ফজিলত (মর্যাদা) ও অগ্রাহ্য করার পরিনাম সংশ্লিষ্ট আয়াত, হাদীস ও (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) তার ব্যাখ্যা নোটসহ উপস্থাপিত হলো:
➧ “অতএব তুমি জেনে রাখো যে আল্লাহ্ ব্যতীত কোন প্রকৃত মাবুদ বা উপাস্য নেই।” (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত নং ৯)
ব্যাখ্যা: এখানে জেনে রাখো বলতে উপরে বর্ণিত তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ত্ববাদ সম্পর্কিত জ্ঞান ও বিশ্বাস সহকারে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' এর ঘোষণা, সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তি প্রদান উদ্দেশ্য যা মানব সন্তানের প্রধানতম দায়িত্ব ও অপরিহার্য বা ফরয কর্তব্য।
➧ “অতএব তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও যে নূর (কুরআন) আমরা নাযিল করেছি তাতে ঈমান আন। আর তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত।” (সূরা তাগাবুন, আয়াত নং ৮)
➧ “মহাকালের শপথ! মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয়। আর উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের।” (সূরা আছ্র, আয়াত নং ১-৩)
➧ “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট।” (সূরা বায়্যিনাহ্, আয়াত নং ৭-৮)
➧ “যে ব্যক্তি মু’মিন অবস্থায় সৎকর্ম নিয়ে উপস্থিত হবে, তাদের জন্য রয়েছে সুউচ্চমর্যাদা।” (সূরা ত্বা-হা, আয়াত নং ৭৫)
➧ “নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের রব (প্রতিপালক) আল্লাহ’, তারপর অবিচল থাকে (এই কথার উপরে), তাদের কাছে নাযিল হয় (মৃত্যুর সময়, কবরে এবং পুনরুত্থানের সময়) ফেরেশতা (এই বলে) যে, 'তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। আর সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা কিছু তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা তোমরা দাবী করবে। এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ হতে আপ্যায়ন।” (সূরা ফুস্সিলাত, আয়াত নং ৩০-৩২)
➧ “হে আমার বান্দাগণ! যারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিলে এবং আত্মসমর্পণ করেছিলে, আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং কোন চিন্তাও নেই। তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিনীরা জান্নাতে প্রবেশ করো, আজ তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা হবে।” (সূরা যূখরুফ, আয়াত নং ৬৯-৭০)
➧ “(সকল) মান-সম্মান কেবলমাত্র আল্লাহর এবং তাঁর রসূল ও মু’মিনদের জন্যই নির্দিষ্ট; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।” (সূরা মুনাফিকূন, আয়াত নং ৮)
➧ “এটা এজন্য যে, যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ্ই তাদের অভিভাবক; নিশ্চয় কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই।” (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত নং ১১)
➧ “আমার কর্তব্য হচ্ছে মু’মিনদেরকে সাহায্য করা।” (সূরা রূম, আয়াত নং ৪৭)
➧ “পুরুষ ও নারী যে কেউই বিশ্বাসী হয়ে সৎকর্ম করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই সুখী জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।” (সূরা আন-নাহল, আয়াত নং ৯৭)
➧ “নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের আতিথেয়তার জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখান থেকে তারা স্থানান্তরিত হতে চাইবে না।” (সূরা কাহাফ, আয়াত নং ১০৭-১০৮)
➧ “আর যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে না তবে নিশ্চয় আমি কাফিরদের জন্য জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত রেখেছি।” (সূরা ফাত্হ, আয়াত নং ১৩)
➧ “যারা অবিশ্বাস করে, তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি এবং যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (সূরা ফাতির, আয়াত নং ৭)
➧ ঈমানের দরজা (স্তর) সত্তরের অধিক এবং তার সর্বনিম্ন স্তর হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা এবং সর্বোচ্চ স্তর হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ - বলা । তিরমিজী ২৬১৪, নাসায়ী ৫০০৪, মুসলিম ।
➧ হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, “কোন বান্দা এমন নেই যে, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলে আর তার জন্য আকাশসমূহের দরজাগুলো খুলে যায় না। এমনকি এ কালেমা সোজা আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে শর্ত হচ্ছে, এর পাঠকারী কবীরাহ্ গুনাহ্ থেকে বেঁচে থাকবে।” (তিরমিযী হা/৩৫৯০, সহীহ্ জামিঊস সাগীর হা/৫৬৪৮)
➧ মু'আয (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সত্য-চিত্তে (ইখলাসের সাথে) 'আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ্' বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” সবাই জিজ্ঞাসা করে, ‘ইখলাসের অর্থ কি?’ তিনি (ﷺ) বলেন, “ইখলাসের অর্থ হলো এই যে, কালেমা তৈয়্যেবা পাঠ করার পর ঐ ব্যক্তি আল্লাহর দ্বারা হারাম বলে ঘোষিত বস্তুর উপভোগ থেকে ক্ষান্ত হয়ে যাবে।” (আহমাদ ২২০০৩, বাইহাক্বীর শুয়াবুল ঈমান ৭, সিলসিলাহ্ সহীহাহ ২২৭৮, তারগীব ও তারহীব)
আর মুসনাদ আহমাদ-এ রেফা'আজ-এর যে বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে তার ভাষা হলো এই, “যে ব্যক্তি সাচ্চা মনে এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই এবং সাক্ষ্য দেয় যে আমি [মুহাম্মদ (ﷺ)] আল্লাহর রসূল আর তারপর সোজা রাস্তায় (সিরাতুল মুস্তাকীম) চলে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
➧ উসমান (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, “যে ব্যক্তি 'আল্লাহ্ ছাড়া কেউ সত্য উপাস্য নেই' এ কথা জানা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (মুসলিম ১৪৫, আহমাদ ৪৬৪)
➧ মু'আয বিন জাবাল (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেছেন, “যার শেষ কথা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (আহমাদ ২২০৩৪, আবূ দাঊদ ৩১১৮, হাকেম ১২৯৯, সহীহুল জামে ৬৪৭৯)
➧ হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের মৃত্যু পথযাত্রীকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ তালকীন করাও। কেননা যে ব্যক্তির মৃত্যুর সময় শেষ কথা হবে ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ্’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (হাদীস: হাসান, ইবনু হিব্বান হা/৩০০৪, ইরওয়াউল গালীল হা/৬৮৭)
➧ আব্দুল্লাহ্ বিন উমার কর্তৃক বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, “অবশ্যই তোমাদের হৃদয়ে ঈমান জীর্ণ হয়; যেমন জীর্ণ হয় পুরনো কাপড়। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্তা’আলার কাছে প্রার্থনা কর, যাতে তিনি তোমাদের হৃদয়ে তোমাদের ঈমান নবায়ন করে দেন।” (ত্বাবারানী, হাকেম ৫, সহীহুল জামে’১৫৯০)
➧ রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেন, “তোমরা তোমাদের ঈমানকে নবায়ন কর।” জিজ্ঞাসা করা হলো, “কিভাবে আমরা আমাদের ঈমানকে নবায়ন করবো?” রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, “তোমরা বলো, ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ্’।” (মুসতাদরাক হাকেম)
নোট: প্রার্থনার সাথে সাথে জাগ্রত অবস্থায়, ঘুমানোর পূর্বে, বৈঠক অবস্থায়, শায়িত অবস্থায় এবং চলতে-ফিরতে খাস-দিলে (অর্থাৎ ইখলাসের সাথে) কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্”পাঠ করা, জিকির করা ঈমান নবায়নের এবং শুভ পরিনাম লাভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
➧ হুযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলবে, একদিন না একদিন এই কালেমা অবশ্যই তার উপকারে আসবে। যদিও ইতিপূর্বে তাকে কিছুটা শাস্তিভোগ করতে হবে।” (হাদীস সহীহঃ বাযযার হা/৮২৯২, সহীহ আত-তারগীব হা/১৫২৫, ত্বাবারানী হা/১৪০)
নোট: উক্ত হাদীসের আলোকে মুহাদ্দিসীনগণের অভিমতঃ ঈমান জানা ও উপলব্ধির নাম, আর ইসলামের আমলসমূহ বাস্তবে ঈমানকে রূপদানের নাম। ঈমান বৃক্ষস্বরূপ, আর অন্যান্য আমলসমূহ তার ডালপালার মতো। যে ব্যক্তি উক্ত কালেমা আন্তরিকতার সাথে বলবে সে গুনাহগার হলেও কোন একসময় জান্নাত পাবে। কিন্তু “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কাউকেই তার ‘আমল (‘ইবাদাত-বন্দেগী) মুক্তি দিতে পারবেনা।’সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়ারাসুলুল্লাহ (ﷺ)! আপনার ক্ষেত্রেও কি তাই?”, নবীজি (ﷺ) জবাবে বললেন, “হ্যা, আমার ক্ষেত্রেও তাই, যদি না আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রহমত দিয়ে আমাকে ঢেকে নেন, তবুও তোমরা সঠিকভাবে ‘আমল করতে থাকবে ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতে কিছু ‘আমল করবে। সাবধান! তোমরা (‘ইবাদাতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে, মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। তাতে তোমরা তোমাদের মঞ্জীলে মাকসুদে পৌঁছে যাবে।’।” (সহীহ: বুখারী ৬৪৬৩, মুসলিম ২৮১৬) সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া ব্যতীত কেউ জান্নাতে যেতে পারবেনা তাহলে আমাদেরকে আমল করতে হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং তার নির্দেশের জন্য আর সর্বদা আত্মসমর্পিত অবস্থায় থেকে আল্লাহর রহমতের আশায় থাকতে হবে। আল্লাহ এই তৌফিক দিন।
➧ “পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোই সৎকর্ম নয়, কিন্তু সৎকর্ম হলো যে ব্যক্তি আল্লাহ্, শেষদিবস, ফেরেশ্তাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনবে। আর সম্পদ দান করবে তার ভালবাসায় আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত দিবে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ করবে, অর্থ-সংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে। তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৭৭)
নোট: উপরের মূল অনুবাদে আল্লাহর সাথে ৪র্থ দফার অঙ্গীকারনামায় রসূলের আনুগত্য ও তাঁর প্রদর্শিত পথে ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে সৎকাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সূরা কাহাফের আয়াতে। একইভাবে সূরা বাকারার উক্ত আয়াতে ঈমানের ছয়টি রুকনের মধ্যে পাঁচটি রুকনের উল্লেখ করে তৎসঙ্গে পাঁচটি প্রধানতম সৎকাজের কথা বলা হয়েছে। ঈমানের সাথে যারা ঐসব সৎকাজ সম্পাদন করবে, তাদেরকে সত্যপরায়ণ ও মুত্তাক্কী বলে আল্লাহ্পাক সার্টিফিকেট দিয়েছেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ঈমানের সাথে সৎকাজ সম্পাদন ঈমানের অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ। ঈমানের অর্থ শুধু আল্লাহ্ও তাঁর রসূলে বিশ্বাস করাই নয়। বরং সহীহ হাদীসের বর্ণনার আলোকে ষাটের অধিক ঈমানের শাখার মধ্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলে ঈমান আনাকে তার সর্বোচ্চ স্তর এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাকে তার সর্বনিম্ন স্তর বলা হয়েছে। সেকারণেই উপরের অনূদিত অংশে মূললেখকবৃন্দ ঈমান বলতে অন্তরের বিশ্বাস, মুখে হৃদয় দিয়ে সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গের দ্বারা রসূলের সুন্নাহ্ (যা আল্লাহ্কর্তৃক প্রদত্ত আইনসম্মত বিষয়াদি, নির্দেশনা, ইবাদত ইত্যাদি) মোতাবেক আমল বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। তদ্রুপ আমলের স্তর অনুপাতে ব্যক্তি মুসলিম, মু’মিন (যারা পরহেযগার বা মুত্তাক্কী) বা মুহসীনের উচ্চস্তরে উন্নীত হতে পারে। প্রাসঙ্গিক উল্লেখ্য যে, নবীজির (ﷺ) যামানায় মুনাফিক ও মুশরিক মুগীরা, ওতবা, শাইবা ও আবূ জেহেলের মত নেতারা কথায় কথায় আল্লাহর নাম নিয়ে বা তাঁর শপথ করে কথা বলতো। কুরআনের বর্ণনায় বুঝা যায় যে তারাও আল্লাহ্র তাওহীদে রবুবিয়্যাহ বা আল্লাহর প্রভুত্বের একত্ববাদে বিশ্বাস করতো যার বর্ণনা কুরআনে রয়েছে (সূরা ইউসুফ ১০৬, আনকাবুত ৬১ ও ৬৩, মুমিনুন ৮৪-৮৯, আয-যুমার ৩) । কিন্তু তাঁর ইবাদত ও গুনাবলীর একত্ববাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর সৃষ্টিকে সমকক্ষ বা অংশীদার গণ্য করতো। তদুপরি রেসালাত ও অন্যান্য দ্বীনী বিষয় অস্বীকার করতো। সেসব কারনে প্রকৃত ঈমানদার হবার পরিবর্তে তারা ছিলো মুশরিক। যেকারণে তাদের বিরূদ্ধে রসূল (ﷺ) এর নেতৃত্বে জিহাদ হয়েছে।
➧ হযরত উবাদা ইবনে ছামেত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নিজে রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন প্রকৃত মাবূদ নেই এবং মুহাম্মদ (ﷺ) তাঁর রসূল, আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন।” (মুসলিম, মা’আরিফুল হাদীস হা/৭৯)
ব্যাখ্যা: উপরোক্ত হাদীসসমূহে তাওহীদ ও রেসালতের সাক্ষ্য দানের অর্থ হচ্ছে ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করে নেয়া এবং সে অনুযায়ী চলা। অন্য শব্দে একথাও বলা যায় যে, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্'-এ কথার সাক্ষ্য দানের মধ্যে সম্পূর্ণ ইসলাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যে ব্যক্তি চিন্তা-ভাবনা করে এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছে, সে আসলে পূর্ণ ইসলামকে নিজের দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) বানিয়ে নিয়েছে। এখন যদি একান্তই মানবীয় দূর্বলতার কারণে তাঁর পক্ষ থেকে কোন ক্রটি-বিচ্যুতি হয়েই যায়, তাহলে তাঁর ঈমানী অনুভূতিই তাকে শরীয়ত নির্ধারিত পন্থায় কাফ্ফারা আদায় করে অথবা তওবা করে পবিত্র হয়ে যেতে বাধ্য করবে। তাই সে যদি পবিত্র হয়ে যায়, তাহলে জাহান্নামের আযাব থেকে নিরাপদই থাকবে।
এ মূলনীতির আলোকে এই ধরণের হাদীসমূহের উদ্দেশ্য কেবল এতটুকুই যে, তাওহীদ ও রেসালাতের সাক্ষ্যদানের নিজস্ব দাবী এটাই যে, এর দ্বারা মানুষ জাহান্নামের আযাব থেকে নিরাপদ থাকবে এবং জান্নাতে যাবে। কিন্তু সে যদি দূর্ভাগ্যবশতঃ এমন কিছু খারাপ আমলও করে থাকে, যেগুলোর নিজস্ব দাবী শাস্তি পাওয়া এবং জাহান্নামে যাওয়া বলে কুর'আনে বলা হয়েছে, তাহলে এগুলোও তাঁর নিজস্ব কিছু না কিছু প্রভাব দেখিয়েই ছাড়বে। এই ছোট তত্ত্ব কথাটি স্মরণে রাখলে সুসংবাদ ও সতর্কবাণী এবং ভয় প্রদর্শন সম্পর্কীয় শত শত হাদীসের বেলায় মানুষের মধ্যে যে ভূল বুঝাবুঝি এবং এর কারণে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়, ইনশাল্লাহ্ তা আর থাকবে না। (মাওলানা মনযূর নুমানী, মা’আরিফুল হাদীস, প্রথম খন্ড হা/১১, ১৮)
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আল্লাহর যে বান্দা মুসলমানদের কোন ইয়াতীম সন্তানকে তার খাবার ও পানীয়তে গ্রহণ করলো, আল্লাহ তাকে অবশ্যই জান্নাতে দাখিল করবেন। তবে যদি সে কোন ক্ষমাহীন কাজ করে থাকে। -তিরমিযী
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা গেলো যে, ইয়াতীমের দায়িত্ব গ্রহণ ও প্রতিপালনে অন্তর্ভুক্ত করা – এই শর্তের সাথে জান্নাতের সুসংবাদ যে, সেই ব্যক্তি এমন কোন মারাত্নক পাপে জড়িত নয় যা আল্লাহর নিকট ক্ষমার অযোগ্য (যেমন – শিরক, অন্যায় হত্যা ইত্যাদি) মুলতঃ এই শর্ত এজাতীয় সব সুসংবাদবাহী হাদীসের সাথে সম্পৃক্ত, যদিও হাদীসের শব্দে উল্লেখ না থাকে। সর্বাবস্থায় সামগ্রিক নীতিমালা অনুযায়ী এ জাতীয় সব উৎসাহ ব্যঞ্জক ও সুসংবাদবাহী হাদীসে এটা লক্ষ্য রাখা চাই।
➧ ওহ’ব বিন মুনাব্বেহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তাকে [মুহাম্মদ (ﷺ)] জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত কোন মা’বুদ নাই (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ্)’এই কালেমা কি বেহেশতের কুঞ্জি নহে (সুতরাং আপনি আমলের জন্য এত তাকীদ করেন কেন?)? উত্তরে তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় (ইহা কুঞ্জি); কিন্তু প্রত্যেক কুঞ্জিরই দাঁত থাকে। যদি তুমি দাঁতওয়ালা কুঞ্জি নিয়ে যাও, তবেই তো তোমার জন্য (বেহেশতে দরজা) খোলা হইবে; অন্যথায় উহা তোমার জন্য খোলা যাইবে না (আর কালেমার দাঁত হইলো আমল) ।’ (বুখারী, মিশকাত ১ম খন্ড হা/৩৯)
➧ হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “আমি এ বিষয়ে নির্দেশপ্রাপ্ত যে, আমি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ অব্যাহত রাখি, যে পর্যন্ত না তারা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’র স্বীকৃতি দান করে।
অতএব, তারা যখন 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রবক্তা হয়ে যাবে, আমাদের মতই নামায আদায় করবে, আমাদের কেবলার অনুসরণ করবে এবং আমাদের যবেহকৃত পশু খাবে, তখন তাদের শোণিত ও তাদের সম্পদ আমাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে, তবে ইসলামের কোন অধিকারের কারণে যদি ব্যতিক্রম হয় তবে তা ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাব-নিকাশের ভার আল্লাহর উপর ন্যস্ত থাকবে।” -বুখারী
➧ হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, “জাহান্নাম থেকে ঐ ধরণের সকল মানুষকেই বের করে আনা হবে, যারা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু' বলেছিল এবং যাদের অন্তরে যবের দানা পরিমাণ পূণ্যও ছিল। তারপর ঐ সব লোকদেরকেও বের করে আনা হবে, যারা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু' বলেছিল এবং তাদের অন্তরে গমের দানার সমান পূণ্যও ছিল। তারপর ঐ সব লোকদেরকেও বের করে আনা হবে, যারা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু' বলেছিল এবং তাদের অন্তরে অণু পরিমাণ পূণ্যও ছিল।” -বুখারী, মুসলিম, মা’আরিফুল হাদীস, ১ম খণ্ড হা/১৯
ব্যাখ্যা: পূর্বে উল্লেখিত অনেক হাদীসের ব্যাখ্যায় যেমন বিস্তারিতভাবে ও প্রামাণ্যরূপে লিখা হয়েছে, তেমনিভাবে এ হাদীসেও 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলা দ্বারা ইসলাম কবুল করা এবং এর স্বীকৃতি প্রদান করাই উদ্দেশ্য। এর ভিত্তিতে হাদীসের মর্ম এটাই হয় যে, যেসব মানুষ ইসলামের কালেমা পাঠ করে এবং নিজেদেরকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত রাখে, আর তাদের অন্তরে অণু পরিমাণ পূণ্য (অর্থাৎ ইসলামের আলো) থাকে, তারাও শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসবে। এ হাদীসে তিনটি স্থানে 'খায়র' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যার অনুবাদ আমরা 'পূণ্য' শব্দ দিয়ে করেছি। কিন্তু হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণিত এ হাদীসেরই অন্য এক রেওয়ায়তে (যেটি ইমাম বুখারীও উল্লেখ করেছেন) 'খায়র' শব্দের স্থলে 'ঈমান' শব্দও এসেছে, যা একথার স্পষ্ট প্রমাণ যে, এখানে পূণ্য দ্বারা ঈমানের আলোই উদ্দেশ্য।
এ হাদীস দ্বারা হকপন্থীদের দু'টি বিশেষ ও সর্বসম্মত এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ আকীদার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানা যায়। প্রথম বিষয়টি এই যে, অনেক কালেমা পাঠকারী লোক নিজেদের বদ আমলের কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি এই যে, তাদের অন্তরে যদি হালকা এবং দুর্বল এমনকি হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী অণু পরিমাণ ঈমানও থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত তারা জাহান্নাম থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। এটা হতে পারে না যে, কোন অতি নিম্ন স্তরের ঈমানদারও কাফের-মুশরিকদের মত চিরকাল জাহান্নামে পড়ে থাকবে, তারা আমলের বিবেচনায় যত বড় ফাসেক ও পাপাচারীই হোক না কেন।