‘আন-নিফাক (কপটতা বা মুনাফিকী)’ বুঝার জন্য সংশ্লিষ্ট আয়াত, হাদীস, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা এবং নোট উপস্থাপন করা হলোঃ

নিফাকঃ আরবীতে “নিফাক” শব্দের অর্থ কপটতা (hypocrisy) । শব্দটির মূল অর্থ গোপন করা, অস্পষ্ট করা। নিফাকে লিপ্ত ব্যক্তিকে মুনাফিক বলা হয়। অন্তরের অবিশ্বাস গোপন রেখে মুখে ঈমানের দাবী করাকে ‘কুফরু নিফাক’ বা ‘নিফাক ইতিকাদী’ বলা হয়। নিফাক বা মুনাফিকী কুফর এর একটি বিশেষ দিক যা কুরআন ও হাদীসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। (সুত্র: অধ্যাপক ডঃ খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে ইসলামী আক্বীদা)

মুনাফিকের স্বভাব-আচরণ ও তার পরিণাম:

মুনাফিকের স্বভাব-আচরণ ও তার পরিণাম সম্পর্কে কুরআনের আয়াতসমূহ:

➧ “আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও রহিয়াছে যাহারা বলে, আমরা আল্লাহ্ ও আখিরাতে ঈমান আনিয়াছি, কিন্তু তাহারা মু’মিন নয়; আল্লাহ্ এবং মু’মিনগণকে অতঃপর তাহারা প্রতারিত করিতে চাহেঅথচ তাহারা যে নিজেদেরকে ভিন্ন কাহাকেও প্রতারিত করে না, ইহা তাহারা বুঝিতে পারে না। তাহাদের অন্তরে ব্যাধি রহিয়াছে। আল্লাহ্ তাহাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করিয়াছেন ও তাহাদের জন্য রহিয়াছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তাহারা মিথ্যাবাদী। তাহাদের যখন বলা হয়, পৃথিবীতে আশান্তি সৃষ্টি করিও না তাহারা বলে আমরাই তো শান্তি স্থাপনকারী। সাবধান! ইহারাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু ইহারা বুঝিতে পারে না। যখন তাহাদেরকে বলা হয়, যে সকল লোক (নবীজির সাহাবিরা) ঈমান আনিয়াছে তোমরাও তাহাদের মত ঈমান আনয়ন কর, তাহারা বলে, ‘নির্বোধগণ যেরূপ ঈমান আনিয়াছে আমরাও কি সেইরূপ ঈমান আনিব?’ সাবধান! ইহারাই নির্বোধ, কিন্তু ইহারা জানে না (ইসলামের জন্য ঈমানদারদের জিহাদ, দান সদকা ইত্যাদি নানাবিধ ত্যাগ স্বীকারকে মুনাফিকরা নির্বোধের কাজ মনে করে) ।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ৮-১৩)

➧ “আর মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবন সম্বন্ধে যাহার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং তাহার অন্তরে যাহা আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২০৪)

➧ “যখন তাহাকে বলা হয়, ‘তুমি আল্লাহকে ভয় কর’, তখন তাহার আত্নাভিমান (অহংকার) তাহাকে পাপানুষ্ঠানে লিপ্ত করে, সুতরাং জাহান্নামই তাহার জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয় উহা নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২০৬)

➧ “তাদের (মুনাফিকদের) উপমা ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালালো; তারপর যখন তার চারিদিক আলোকিত করলো, আল্লাহ তখন তাদের আলো নিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিলেন, যাতে তারা কিছুই দেখতে পায় না।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৭)

ব্যাখ্যা: তারা ঈমানদারদের সংস্পর্শে থেকে ঈমানের আলো পেয়েছে যার লেশমাত্রও তাদের কাছে ছিল না। তারপর পার্থিব জীবনে লোভ-লালসা ও কু-প্রবৃত্তির তাড়নায় পাপাচারে লিপ্ত হয়ে যায়, এমনকি কুফরী কথা ও কাজে লিপ্ত হয় এবং ঈমানের আলো বঞ্চিত হয়ে সুস্থ জ্ঞান-বিবেক হারিয়ে ফেলে। এভাবে মুনাফিকরা কাফিরদের মধ্যেই শামিল (তবে বিশেষ বৈশিষ্টের কারণে আলাদা নামে অভিহিত) এবং উভয়ের পরিণতি জাহান্নাম। -(তাফসীরে আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)

➧ “তারা বধির, বোবা, অন্ধ, কাজেই তারা ফিরে আসবে না।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৮)

ব্যাখ্যা: ইবনে আব্বাস বলেন, এর অর্থ, তারা হেদায়াত শুনতে পায় না, দেখতে পায় না এবং তা বোঝতেও পারে না। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তারা কল্যাণ শুনতে পায় না, দেখতে পায় না এবং বোঝতেও পারে না। সুতরাং তারা হেদায়াতের দিকে ফিরে আসবে না, কল্যাণের দিকেও নয়। ফলে তারা যেটার উপর রয়েছে সেটার উপরই থাকবে। সুতরাং নাজাত বা মুক্তি তাদের নসীবে জুটবে না। কাতাদাহ বলেন, তারা তাওবাহ করবে না এবং উপদেশও গ্রহণ করবে না। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “আর আমরা তাদেরকে দিয়েছিলাম কান, চোখ ও হৃদয়; অতঃপর তাদের কান, চোখ ও হৃদয় তাদের কোন কাজে আসেনি; যখন তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিলআর যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত, তা-ই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল।” [সূরা আল-আহকাফ: ২৬] [আদওয়াউল বয়ান]।

(তাফসীরে আবূ বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)

➧ “বিদ্যুৎ চমকে তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়ার উপক্রম হয়। যখনই বিদ্যুতালোক তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় তখনই তারা পথ চলে এবং যখন অন্ধকারে ঢেকে যায় তখন তারা থমকে দাঁড়ায়। আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হরণ করতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২০)

ব্যাখ্যা: ইবনে আব্বাস বলেন, এখানে (بَرْقٌ) বলে, কুরআনের অকাট্য আয়াতগুলোকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের অকাট্য আয়াতগুলো বাহকের তীব্র আলো যেন মুনাফিকদের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিতে চায়। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফেকদের সম্পর্কে যে উপমা দিচ্ছেন তার মর্মার্থ হলো-এমন ব্যক্তির উদাহরণ যে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের মধ্যে পথ অতিক্রম করছে, যাতে রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের অন্ধকার। রাতের আঁধার, মেঘের আঁধার এবং বৃষ্টির আঁধার। আরও রয়েছে তাতে বিকট শব্দসম্পন্ন বজ্র, বিদ্যুত চমক। এ ভীষণ অন্ধকারে যখন বিদ্যুত চমকায় তখন সে সামনে এগোয়, আবার যখন অন্ধকারে ছেয়ে যায় তখন সে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। মুনাফেকদেরও ঠিক অনুরূপ অবস্থা, যখন তারা কুরআনের আদেশ-নিষেধ, পুরস্কার ও শাস্তির কথা শোনে তখন তারা নিজেদের কানে আঙুল দেয়কুরআনের আদেশনিষেধ, পুরস্কার-শাস্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকেকারণ এগুলো তাদেরকে বিব্রত করেতারা এগুলোকে এমনভাবে অপছন্দ করে যেমনিভাবে ঐ ব্যক্তি মৃত্যুভয়ে বজ্রের শব্দকে অপছন্দ করে কানে আঙুল দিতকিন্তু মুনাফেকরা যত বিব্রতই হোক তারা কোনভাবেই নিরাপত্তা লাভ করতে পারবে নাকারণ আল্লাহ্‌ তাদেরকে তার জ্ঞান, ক্ষমতা ও শক্তি দ্বারা পরিবেষ্টন করে আছেন। তারা কোনভাবেই তাঁর হাত থেকে নিস্কৃতি পাবে না বা তাঁকে অপারগও করে দিতে পারবে না। বরং আল্লাহ্‌ তাদের কর্মকাণ্ডের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব করে সে অনুসারে তাদেরকে শাস্তি দেবেন। [তাফসীর আস-সাদী]

ইবনে কাসীর বলেন, কেয়ামতের দিনেও তাদের অবস্থা হবে এই যে, যখন লোকদেরকে তাদের ঈমান অনুযায়ী নূর দেয়া হবে, কেউ পাবে বহু মাইল পর্যন্ত, আবার কেউ কেউ তার চেয়েও বেশী, কেউ তার চেয়ে কম, এমনকি শেষ পর্যন্ত কেউ এতটুকু পাবে যে, কিছুক্ষণ আলোকিত হয়ে আবার তা অন্ধকার হয়ে যাবে। কিছু লোক এমনও হবে যে, তারা একটু গিয়েই থেমে যাবে, আবার কিছু দূর পর্যন্ত আলো পাবে, আবার তা নিভে যাবে। আবার এমন কিছু লোকও হবে যাদের আলো সম্পূর্ণভাবে নিভে যাবেএরাই হচ্ছে প্রকৃত মুনাফিক, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ্‌ বলেছেন, “সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের নূরের কিছু গ্রহণ করতে পারি’বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও নূরের সন্ধান কর”। (সূরা আল-হাদীদ, আয়াত নং ১৩)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে পড়েছে যে, পবিত্র কুরআনের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত মানুষকে কয়েক শ্রেনীতে ভাগ করা হয়েছেএক. খাঁটি মুমিন। সূরা আল বাকারার প্রথম চার আয়াতে তাদের পরিচয় দেয়া হয়েছে। দুই. খাঁটি কাফের। তাদের বর্ণনা পরবর্তী দুই আয়াতে প্রদত্ত হয়েছে। তিন. মুনাফিক, যারা আবার দুশ্রেণীরপ্রথম. খাঁটি মুনাফেকআগুন জ্বালানোর উপমা দিয়ে তাদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছেদ্বিতীয়. সন্দেহের দোলায় দোদুল্যমান মুনাফিকতারা কখনো ঈমানের আলোকে আলোকিত হয়, কখনো কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। বজ্র ও বিদ্যুতের উদাহরণ পেশ করে তাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম দলের অবস্থা থেকে তাদের মুনাফেকী একটু নরম। এ বর্ণনার সাথে সূরা আন-নূরের ৩৫ নং আয়াতের বর্ণনার কোন কোন দিকের মিল রয়েছে [ইবনে কাসীর]। এর মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুমিনরা দু’ভাগে বিভক্তএক. সাবেকুন বা মুকাররাবুন, দুই. আসহাবুল ইয়ামীন, আবরার বা সাধারণ মুমিনআর কাফেররা দু’ভাগে বিভক্ত: এক. অনুসৃত, বা কুফরির দিকে আহবানকারী কাফের দল, দুই. অনুসারী বা অনুসরণকারী সাধারণ কাফেররাঅনুরূপভাবে মুনাফিকদেরও শ্রেণী দুটিপ্রথম শ্রেণীর মুনাফিক হচ্ছে সেসব কট্টর মুনাফিক যাদের অন্তরে ঈমানের লেশমাত্র নেইদ্বিতীয় শ্রেণীর মুনাফিকের অন্তরে ঈমানের কিছু থাকলেও নিফাকের সব চরিত্র তাদের মধ্যে বিদ্যমান। [ইবনে কাসীর]

(তাফসীরে আবূ বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)

➧ “যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর ভঙ্গ করে, আর যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ্‌ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং যমীনের উপর ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৭)

ব্যাখ্যা: আবুল আলীয়া বলেন, এটি মুনাফিকদের ছয়টি স্বভাবের অন্তর্গত। তারা কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে খেলাফ করে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে, সাথে সাথে আয়াতে বর্ণিত তিনটি কাজ, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, আর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং যমীনের উপর ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়। [আত-তাফসীরুস সহীহ] (তাফসীরে আবূ বক্‌র যাকারিয়া)

➧ “তাহাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহার দিকে এবং রসূলের দিকে আসো (একত্ববাদ ও ইসলামী আইন বিধান অনুসরণে), তখন মুনাফিকদেরকে তুমি তোমার নিকট হইতে মুখ একেবারে ফিরাইয়া লইতে দেখিবে। তাহাদের কৃতকর্মের জন্য যখন তাহাদের কোন মুসীবত হইবে, তখন তাহাদের কি অবস্থা হইবে? অত: পর তাহারা আল্লাহর নামে শপথ করিয়া তোমার নিকট আসিয়া বলিবে, “আমরা কল্যান ও সম্প্রীতি ব্যতিত অন্য কিছুই চাই নাই।” এরাই তারা, যাদের অন্তরে কি আছে আল্লাহ তা জানেনকাজেই আপনি তাদেরকে উপেক্ষা করুন, তাদেরকে সদুপদেশ দিন এবং তাদেরকে তাদের মর্ম স্পর্শ করে এমন কথা বলুন।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ৬১-৬৩)

➧ “তাহাদের মধ্য হতে কাহাকেও বন্ধু ও সহায়রূপে গ্রহণ করিবে না।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ৮৯)

➧ “নিশ্চয়ই যাহারা ঈমান আনে ও পরে কুফরী করে এবং আবারঈমান আনে, আবার কুফরী করে অতঃপর তাহাদের কুফরী প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তাহাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করিবেন না এবং তাহাদেরকে কোন পথও দেখাইবেন না। মুনাফিকদের শুভ সংবাদ দাও যে, তাহাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রহিয়াছে। কিতাবে তোমাদের প্রতি তিনি তো অবতীর্ণ করিয়াছেন যে, যখন তোমরা শুনিবে, আল্লাহর আয়াত প্রত্যাখ্যাত হইতেছে এবং ইহাকে বিদ্রুপ করা হইতেছে, তখন যে পর্যন্ত তাহারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত না হইবে তোমরা তাহাদের সঙ্গে বসিও না অন্যথায় তোমরাও উহাদের মত হইবেমুনাফিক এবং কাফির সকলকেই আল্লাহ্ তো জাহান্নামে একত্র করিবেন। দোটানায় দোদুল্যমান-না ইহাদের দিকে, না উহাদের দিকে! এবং আল্লাহ যাহাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি তাহার জন্য কখনও কোন পথ পাইবে না। হে মু’মিনগণ! তোমরা মু’মিনগণের পরিবর্তে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না। তোমরা কি আল্লাহকে তোমাদের বিরূদ্ধে স্পষ্ট প্রমাণ দিতে চাও? মুনাফিকরা তো জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকিবে এবং তাহাদের জন্য তুমি কখনও কোন সহায় পাইবে না (যা কোন অমুসলিম বা মুশরিকের ক্ষেত্রেও বলা হয়নি। এটা থেকে বুঝা যায় মুনাফিকরা মানব সমাজের নিকৃষ্টতম জীব।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৩৭-১৪৫)

➧ “তাহাদের জন্য আছে দুনিয়ার লাঞ্ছনা আর আখিরাতে রহিয়াছে তাহাদের জন্য মহাশাস্তি। (৪২) তাহারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল এবং অবৈধ ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত...।” (সূরা মায়িদাহ্, আয়াত নং ৪১-৪২)

➧ “এবং তুমি উহাদেরকে প্রশ্ন করিলে উহারা নিশ্চয়ই বলিবে, “আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করিতেছিলাম।” বল “তোমরা কি আল্লাহ, তাঁহার নিদর্শন ও তাহার রসূলকে বিদ্রপ করিতেছিলে?” তোমরা দোষ স্খালনের চেষ্টা করিও নাতোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করিয়াছ। তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করিলেও অন্য দলকে শাস্তি দিব-কারণ তাহারা অপরাধী। (সূরা তওবা, আয়াত নং ৬৫-৬৬)

নোট: ৬৬ নং আয়াত থেকে এটি স্পষ্ট যে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করার মাধ্যমে প্রকাশ্যে ঈমানের দাবী মূল্যহীন হয়ে গেছে। তাদের কুফরী প্রকাশ হয়ে গেছে। এরপরেও যেসব লোক নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তওবা করে খাঁটি মুসলিম হয়ে গেছে তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু যাদের ভাগ্যে তা জোটেনি এবং কুফরি ও মুনাফেকির উপর অটল থেকেছে সেসব পাপিষ্ঠ অপরাধীদের তিনি শাস্তি দিবার কথা বলেছেন।

➧ “মুনাফিক নর ও মুনাফিক নারী একে অপরের অনুরূপ। ইহারা অসৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং সৎকর্ম নিষেধ করে উহারা নিজেদের হাতগুলি (আল্লাহর পথে ব্যয় করা হতে) বন্ধ করিয়া রাখে, উহারা আল্লাহকে বিস্মৃত হইয়াছে, ফলে তিনিও উহাদেরকে বিস্মৃত হইয়াছেন; মুনাফিকরা তো পাপাচারী। মুনাফিক নর, মুনাফিক নারী ও কাফিরদেরকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন জাহান্নামের অগ্নির, যেখানে উহারা স্থায়ী হইবে, ইহাই উহাদের জন্য যথেষ্ট এবং আল্লাহ্ উহাদেরকে লা’নত করিয়াছেন এবং উহাদের জন্য রহিয়াছে স্থায়ী শাস্তি।” (সূরা তওবা, আয়াত নং ৬৭-৬৮)

➧ “মু’মিন নর মু’মিন নারী একে অপরের বন্ধু, ইহারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের আনুগত্য করে; ইহাদেরকেই আল্লাহ কৃপা করিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তওবা, আয়াত নং ৭১)

➧ “হে নবী! কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন, তাদের প্রতি কঠোর হোন; এবং তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল!” (সূরা তওবা, আয়াত নং ৭৩)

ব্যাখ্যা: আয়াতে কাফের ও মুনাফিক উভয় সম্প্রদায়ের সাথে জিহাদ করতে এবং তাদের ব্যাপারে কঠোর হতে রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। [তাবারী] প্রকাশ্যভাবে যারা কাফের তাদের সাথে জিহাদ করার বিষয়টি তো সুস্পষ্ট যে তাদের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে জিহাদ করতে হবে, কিন্তু মুনাফিকদের সাথে জিহাদ কিভাবে করতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাদের বিরুদ্ধেও হাত দিয়ে, সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে, তাতেও সম্ভব না হলে অন্তর দিয়ে জিহাদ করতে হবেআর সেটা হচ্ছে তাদেরকে দেখলে কঠোরভাবে তাকানো। [বাগভী] ইবন আব্বাস বলেন, তাদের সাথে জিহাদ করার মর্ম হল মৌখিক জিহাদ এবং কোমলতা পরিত্যাগ। [তাবারী] অর্থাৎ তাদেরকে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে হবে যাতে করে তারা ইসলামের দাবীতে নিষ্ঠাবান হয়ে যেতে পারে। দাহহাক বলেন, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ হচ্ছে, কথায় কঠোরতা অবলম্বন। কাতাদা বলেন, এক্ষেত্রে বাস্তব ও কার্যকর কঠোরতাই বুঝানো হয়েছে, অর্থাৎ তাদের উপর শরীআতের হুকুম জারী করতে গিয়ে কোন রকম দয়া বা কোমলতা করবেন না। [বাগভী] সুত্রঃ তাফসীরে আবূ বকর যাকারিয়া (সংক্ষেপিত)

➧ “তুমি উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর একই কথা; তুমি সত্তর বার উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিলেও আল্লাহ্ উহাদেরকে কখনই ক্ষমা করিবেন না। ইহা এই জন্য যে, উহারা আল্লাহ্ ও তাঁহার রসূলের সঙ্গে কুফরী করিয়াছে। আল্লাহ্ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা তওবা, আয়াত নং ৮০)

➧ “উহাদের মধ্যে কাহারও মৃত্যু হইলে তুমি কখনও উহাদের জন্য জানাযার সালাত পড়িবে না এবং উহাদের কবরপার্শ্বে দাঁড়াইবে না; উহারা তো আল্লাহ্ ও তাঁহার রসূলকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং পাপাচারী অবস্থায় উহাদের মৃত্যু হইয়াছে। সুতরাং উহাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে যেন বিমুগ্ধ না করে; আল্লাহ্ তো উহার দ্বারাই উহাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান; উহারা কাফির থাকা অবস্থায় উহাদের আত্মা দেহত্যাগ করিবে।” (সূরা তওবা, আয়াত নং ৮৪-৮৫)

➧ “আর তিনি মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী যাহারা আল্লাহ্ সম্বন্ধে মন্দ ধারণা পোষণ করে তাহাদেরকে শাস্তি দিবেনঅমঙ্গল চক্র উহাদের জন্য, আল্লাহ্ উহাদের প্রতি রুষ্ট হইয়াছেন এবং উহাদেরকে লা’নত করিয়াছেন এবং উহাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রাখিয়াছেন, উহা কত নিকৃষ্ট আবাস!” (সূরা ফাতহ, আয়াত নং ৬)

➧ “উহারা বলে, “আমরা আল্লাহ ও রসূলের প্রতি ঈমান আনিলাম এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করিলাম”, কিন্তু ইহার পর উহাদের একদল মুখ ফিরাইয়া নেয়; বস্তুত উহারা মু’মিন নয়। এবং যখন উহাদেরকে আহ্বান করা হয় আল্লাহ ও তাহার রসূলের দিকে উহাদের মধ্যে ফয়সালা করিয়া দিবার জন্য তখন উহাদের একদল মুখ ফিরাইয়া নেয়। (সূরা নূর, আয়াত নং ৪৭-৪৮)

➧ মু’মিনদের উক্তি তো এই-যখন তাহাদের মধ্যে ফয়সালা করিয়া দিবার জন্য আল্লাহ এবং তাহার রসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাহারা বলে, “আমরা শ্রবণ করিলাম ও আনুগত্য করিলাম।” আর উহারাই তো সফলকাম।” (সূরা নূর, আয়াত নং ৫১)

➧ “যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তাহারা বলে, ‘আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল।’ আল্লাহ্ জানেন যে, তুমি নিশ্চয়ই তাঁহার রসূল এবং আল্লাহ্ সাক্ষ্য দিতেছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। উহারা উহাদের শপথগুলিকে ঢালরূপে ব্যবহার করে আর উহারা আল্লাহর পথ হইতে মানুষকে নিবৃত্ত করে। উহারা যাহা করিতেছে তাহা কত মন্দ। ইহা এইজন্য যে, উহারা ঈমান আনিবার পর কুফরী করিয়াছেফলে উহাদের হৃদয় মোহর করিয়া দেওয়া হইয়াছে; পরিণামে উহারা বুঝে নাতুমি উহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়ই উহাদের জন্য সমানআল্লাহ উহাদেরকে কখনও ক্ষমা করিবেন নাআল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। (সূরা মুনাফিকুন, আয়াত নং ১-৬)

➧ “যাহাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তাহারা কি মনে করে যে, আল্লাহ কখনও উহাদের বিদ্বেষ ভাব প্রকাশ করিয়া দিবেন না?” (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত নং ২৯)

ব্যাখ্যা: এখানে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুনাফিকদের হিংসা ও বিদ্বেষের কথা বলা হয়েছে যা আল্লাহ প্রকাশ করে দেনমিথ্যা, ষড়যন্ত্র, প্রতারণা সহ মুনাফিকদের নানা রকম চারিত্রিক বৈশিষ্টসমূহ আল্লাহ এমনভাবে প্রকাশ করেছেন যে প্রত্যেক জ্ঞানী / সচেতন ব্যক্তি তা জেনে তাদের দুষ্কর্ম থেকে আত্নরক্ষা করতে পারে। (তাফসীরে ইবনে কাছির, সংক্ষেপিত)

মুনাফিকের স্বভাব-আচরণ ও তার পরিণাম সম্পর্কে হাদীসের বাণী:

➧ রসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলেছেন: চারটি দোষ যাহার মধ্যে বিদ্যমান, সে খাঁটি মুনাফিক; আর যাহার মধ্যে ঐ দোষগুলোর একটি বর্তমান থাকিবে, তাহার মধ্যে মুনাফিকীর একটি স্বভাব থাকিবে যে পর্যন্ত না সে উহা পরিহার করে-ক) যখন তাহার নিকট কিছু আমানত* রাখা হয় (অর্থ, সম্পদ, দলিলাদি বা কোন দায়িত্ব বা গোপন তথ্য ইত্যাদি) তাহাতে সে খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) করে। খ) সে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে, গ) যখন ওয়াদা* করে, ভঙ্গ করে, এবং ঘ) যখন কাহারো সহিত কলহ করে, তখন সে গালাগালি ও অশ্লীল ব্যবহার করে। (বুখারী ৩৪, ২৪৫৯, মুসলিম ২১৯)

বি.দ্র.: এ সকল কর্ম বাহ্যত অন্তরে বিশ্বাসের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে। তবে যদি অন্তরে প্রকৃত অবিশ্বাস না থাকে তবে এসকল কর্ম ‘কুফর’ বা অবিশ্বাসের নিফাক বলে গন্য হবে না। বরং কুফর আসগারের ন্যায় নিফাক আমালী বা কর্মের নিফাক বলে গন্য হবে। -কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

নোট: ১. আমানত -আভিধানিক অর্থে আল্লাহর হক/অধিকার সম্পর্কিত (যাতে শরিয়ত আরোপিত সকল ফরয ও ওয়াজিব পালন এবং যাবতীয় হারাম ও মাকরূহ বিষয়াদি থেকে আত্মরক্ষা করা) বা বান্দার হক/অধিকার (যাতে গচ্ছিত টাকা পয়সা ফেরত দান, গোপন কথা/তথ্য শরিয়ত সম্মত অনুমতি ছাড়া ফাঁস না করা, অর্পিত কাজের দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন করা) সম্পর্কিত এমন প্রত্যেকটি বিষয় সামিল, যার দায়িত্ব কোন ব্যক্তি বহন করে এবং সে বিষয়ে কোন ব্যক্তির উপর আস্থা স্থাপন ও ভরসা করা হয়। (তাফসীর মা’রেফুল কোরআন, সূরা আল-মু’মিনুন, আয়াত নং ৮)

২. যার প্রতি আল্লাহ কোন দায়িত্ব অর্পণ করেন, অতঃপর সে সুষ্ঠভাবে তা পালন করেনা, সে জান্নাতের গন্ধ পাবে না। (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত, ৩৬৮৭)

৩. রসূল (ﷺ) প্রায় খুতবাতে বলতেন, যার আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই। (আহমাদ ১২৩৮২, বাইহাকী ১৩০৬৫, সহীহুল জামে’ ৭১৭৯)

৪. নবী (ﷺ) বলেন, অনেক লোক আছে, যারা আল্লাহর মালে নাহক তসরুফ (তাসার্রুফ) করে থাকে। তাদের জন্য কিয়ামতে জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। (বুখারী ৩১১৮)

➧ আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলিয়াছেন: মুনাফিকের আলামত হইতেছে তিনটা-যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে; যখন ওয়াদা করে, ভঙ্গ করে এবং যখন তাহার নিকট কোন কিছু আমানত রাখা হয়, তাহাতে সে খেয়ানত করে। (বুখারী, মুসলিম) ইমাম মুসলিমের বর্ণনায় ইহাও রহিয়াছে যে, “যদিও সে নামাজও পড়ে, রোজা রাখে এবং মনে করে যে, সে মুসলিম।”

নোট: অর্থাৎ একজন নামাজী এবং রোজাদার ব্যক্তিও মুনাফিক হতে পারে যদি তার মধ্যে মুনাফিকের আলামতগুলির এক বা একাধিক আলামত পাওয়া যায় । তার শাস্তি বা ক্ষমার বিষয়টি তওবা ও ফিরে আসার উপর নির্ভর করবে (আল্লাহই ভালো জানেন) ।

➧ রসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলিয়াছেন: মুনাফিকের উদাহরণ হইতেছে সেই বানডাকা ছাগীর ন্যায় যে দুই ছাগ-পালের মধ্যে থাকিয়া একবার এ পালের দিকে দৌড়ায় আবার ঐ পালের দিকে দৌড়ায়। (মুসলিম শরীফ)

নোট: দ্বীন ইসলামে তার আস্থা বিশ্বাস না থাকার কারণে মুনাফিক ব্যক্তি যেখানে তার জাগতিক স্বার্থ হাসিল হবে সেখানে যায় এবং ফয়সালা তালাশ করে।

➧ হযরত আমীর আর-রামী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) রোগ ব্যাধি সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং বলেন, মু’মিন ব্যক্তির যখন রোগ হয় তারপর আল্লাহ্ তাকে আরোগ্য দান করে, এতে তার অতীত পাপের ক্ষতিপূরণ হয় এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় ও সতর্কবাণী হয়ে থাকে। কিন্তু মুনাফিক আখিরাত থেকে গাফিল। যখন রোগাক্রান্ত হয় এরপর তাকে আরোগ্য দান করা হয়, সে এ থেকে উপকৃত হয় না। তার দৃষ্টান্ত ঐ উটের ন্যায় যাকে তার মালিক বেধেছিলো তারপর ছেড়ে ছিল। অথচ সে বুঝল না যে, কেন তাকে বেধেছিল এবং কেন তাকে ছেড়ে দিল। (মা’আরিফুল হাদীস)

➧ যে ব্যক্তি কারো ধন-সম্পদ ও পরিজনের ব্যাপারে ধোঁকা দেয়, সে জাহান্নামী। (মুসলিম শরীফ)

নোট:

মুনাফিকদের ২৭টি চারিত্রিক বৈশিষ্ট:

উপরে উল্লেখিত কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহের আলোকে আমরা মুনাফিকদের ২৭টি চারিত্রিক বৈশিষ্ট জানতে পারি। সেগুলো হলো-

১) তারা ঘোর মিথ্যাচারী।

২) আমানতের (গচ্ছিত অর্থ সম্পদ বা প্রদত্ত দায় দায়িত্ব যা ব্যক্তির, পারিবারিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় হতে পারে) খেয়ানতকারী (বিশ্বাসঘাতকতা করে যা ফেরত দিবেনা বা নষ্ট করে ফেলবে) ।

৩) ওয়াদা, অঙ্গীকার ও চুক্তি ভঙ্গকারী।

৪) যখন কারো সাথে কলহ করে তখন সে গালাগালি ও অশ্লীল ব্যবহার করে।

৫) ধোকাবাজ, প্রতারক (সুপরিকল্পিতভাবে ব্যক্তিগত লাভের জন্য যা সঠিক নয় এমন কিছুকে সত্য বা সঠিক বলে বিশ্বাস করানো -কেমব্রিজ ডিকশনারি) ।

৬) আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণকারী।

৭) ইসলামী শরীয়তের বিচার বিধান (যা মানা ফরয) অগ্রাহ্য করে খোদাদ্রোহী (তাগুত) বা অন্যান্য বিধানের আওতায় ফয়সালা তালাশ করে (বেশি লাভের আশায়) এবং সেখানে মুসিবত হলে ফিরে এসে অজুহাত পেশ করে।

৮) আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী (মন্দ আচরণ বা তাদের ন্যায্য হক্ব আত্মসাৎ/বঞ্চিত করার মাধ্যমে) ।

৯) রোগ ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের পরেও সে ওই মুসিবত থেকে কোন শিক্ষ্যা গ্রহণ করেনা, সংশোধন হয়না।

১০) ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণকারী (যা আল্লাহ প্রকাশ করে দেন) ।

১১) সৎকাজে বাধা দেয় এবং অসৎ কর্মের নির্দেশ দেয়।

১২) কৃপণ (আল্লাহর পথে ফরয নফল ব্যয় করতে কুন্ঠা বোধ করে) ।

১৩) পাপাচারী।

১৪) ইসলামের বিধান ও আল্লাহ রসূলকে বিদ্রূপকারী।

১৫) অবৈধ ভক্ষণে আসক্ত (অর্থাৎ অবৈধ পথে উপার্জনকারী) ।

১৬) জমিনের উপর ফাসাদ সৃষ্টিকারী।

১৭) তারা তাওবা করেনা, উপদেশও গ্রহণ করেনা।

১৮) মুমিনদের সংস্পর্শে এসে ঈমান আনার পরে লোভ লালসা ও প্রবৃত্তির কারণে বারবার কুফরীতে লিপ্ত হয়।

১৯) আল্লাহকে ভয় করতে বলা হলে তার আত্মাভিমান তাকে পাপানুষ্ঠানে লিপ্ত করে।

২০) ইসলামের জন্য মুমিনদের জিহাদ, অর্থব্যয় ও ত্যাগ স্বীকারকে তারা নির্বোধের কাজ মনে করে এবং তাদের মত ঈমান আনার কথা বললে তারা তা করতে অস্বীকার করে।

২১) তারা দোটানায় দোদুল্যমান, না ইহাদের পক্ষে না উহাদের পক্ষে। তারা অতীব স্বার্থপর, কারোই বন্ধু নয়, মুনাফিকদের ছাড়া।

২২) তাদের পার্থিব কথাবার্তা চমৎকৃত করার মত, কিন্তু বাস্তবে তারা ভীষণ কলহপ্রিয়।

২৩) তারা নিজেদের ঈমানদার বলে দাবি করলেও প্রকৃত ঈমানদার নয়।

২৪) ইসলামী শরীয়তের আইন বিধান পালনের ব্যাপারে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যদিওবা তারা নামাজ পড়ে এবং রোজা রাখে।

২৫) মিথ্যা শপথকারী যা তারা ঢালরূপে ব্যবহার করে।

২৬) তারা মানুষকে আল্লাহর পথ হতে নিবৃত্ত করে।

২৭) তাহাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত যা ষড়যন্ত্র ও কুটিলতার আধার এবং সরলপথ থেকে দূরে।