বহু ঈশ্বরবাদ এবং ইহার প্রকাশিত নানা রূপ

সংজ্ঞাঃ শির্ক মূলতবহু-ঈশ্বরবাদ অর্থাৎ আল্লাহর সাথে সাথে অন্যান্যদের উপাসনা বা ইবাদত। ইহা আল্লাহ্‌ ছাড়াও অন্যান্যদের প্রতি ঐশ্বরিক গুনাবলী আরোপ করার বিষয়ে ইঙ্গিত করে। ইহা বিশেষভাবে আল্লাহ্‌র ইবাদতে অংশীদার সংযুক্ত করার প্রতি ইঙ্গিত করে। অথবা এইরূপ বিশ্বাসের প্রতি ইঙ্গিত করে যে শক্তির উৎস, ক্ষতি এবং দান বা আশীর্বাদ আল্লাহ্‌ ছাড়াও অন্যান্যদের কাছ থেকে আসে।

প্রকারসমূহঃ শির্ক ৩ প্রকারের, যথাঃ

১. আশ-শির্ক আল-আকবার অর্থাৎ বড় শির্ক

২. আশ-শির্ক আল-আসগার অর্থাৎ ছোট শির্ক

৩. আশ-শির্ক আল-খফী অর্থাৎ গোপন শির্ক

সুস্পষ্ট প্রকাশঃ ১) আশ-শির্ক আল-আকবার (বড় শির্ক): বড় এবং গুরুতর বহু-ঈশ্বরবাদের উপাদান যার ৪টি রূপঃ

ক) শির্ক-আদ-দু’আ: অর্থাৎ ঐকান্তিকভাবে যাচনা বা প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে শির্ক করা। ইহা আল্লাহ্‌ ছাড়া ও অন্যান্য দেবদেবীর নিকট অনুনয়, যাচনা বা প্রার্থনা করার প্রতি ইঙ্গিত করে।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন, “উহারা যখন নৌযানে আরোহন করে তখন উহারা বিশুদ্ধচিত্ত হইয়া একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে ভিড়াইয়া উহাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তাহারা শির্কে লিপ্ত হয়।” (সূরা আনকাবুত, আয়াত নং ৬৫)

খ) শির্ক-আল-নিয়্যাহ ওয়াল-ইরাদাহ্‌ ওয়াল-ক্কাস্‌দ: ইহা উপাসনা বা ইবাদাতে ও ধর্মীয় আমলের নিয়াত, উদ্দেশ্য ও সংকল্পের ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যান্য দেবদেবীর দিকে তা করার ইঙ্গিত করে (অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন মূর্তি, দেব-দেবী ইত্যাদির জন্য ইবাদত বা উপাসনা করার নিয়ত করা) ।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন, “যে কেহ পার্থিব জীবন ও উহার শোভা কামনা করে, দুনিয়ায় আমি উহাদের কর্মের পূর্নফল দান করি এবং সেখানে তাহাদেরকে কম দেওয়া হইবেনা। উহাদের জন্য আখিরাতে দোজখ ব্যতীত অন্য কিছুই নাই এবং উহারা যাহা করে আখিরাতে তাহা নিষ্ফল হইবে এবং উহারা যাহা করিয়া থাকে তাহা নিরর্থক।” (সূরা হূদ, আয়াত নং ১৫-১৬)

গ) শির্ক আত-তা’আহ: শির্কের এই রূপ আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে যে কোন কর্তৃপক্ষের (ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক) আনুগত্য করার প্রতি ইঙ্গিত করে।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন, “তাহারা আল্লাহ্‌ ব্যতিত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসার-বিরাগীগণকে তাহাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করিয়াছে এবং মারইয়াম-তনয় মসীহ্‌-কেও। কিন্তু উহারা এক ইলাহের ইবাদতক রিবার জন্যই আদিষ্ট হইয়াছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্‌ নাই। তাহারা যাহাকে শরীক করে তাহা হইতে তিনি কত পবিত্র।” (সূরা তাওবা, আয়াত নং ৩১)

একদা যখন আল্লাহর রসূল (ﷺ) উক্ত আয়াত আবৃত্তি করেছিলেন, আদী বিন হাতিম বলিলেন, হে আল্লাহর রসূল (ﷺ), তাহারা তাহাদের (ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও সন্নাসীদের) পূজা/উপাসনা করে না।” আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলিলেন, “তাহারা নিশ্চিতভাবেই তা করে। তাহারা (যাজক ও সন্ন্যাসীরা) অবৈধ জিনিসকে বৈধ করে এবং বৈধ জিনিসকে অবৈধ করে এবং তাহারা (ইহুদী ও খ্রিস্টানরা) তাহাদের অনুসরন করে; এবং এটা করার দ্বারা তাহারা প্রকৃতপক্ষে তাহাদের ইবাদত/উপাসনা করে। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, এবং ইবনে জারীর (তাফসীর আত -তাবারী, ভলিউম-১০, পৃষ্ঠা-১১৪)

ঘ) শির্ক আল-মাহাব্বাহ: এটা একমাত্র আল্লাহ্‌ যেরূপ ভালোবাসা পাবার অধিকারী তাহা অন্য কাহাকেও দেখানোর প্রতি ইঙ্গিত করে।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন, “তথাপি মানুষের মধ্যে কেহ কেহ আল্লাহ্‌ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহন করে এবং আল্লাহ্‌ কে ভালোবাসার অনুরুপ তাহাদেরকে ভালোবাসে; কিন্তু যাহারা ঈমান আনিয়াছে আল্লাহ্‌র প্রতি ভালোবাসায় তাহারা সুদৃঢ়। যালিমরা শাস্তি প্রত্যক্ষ করিলে যেমন বুঝিবে, হায়! এখন যদি তাহারা তেমন বুঝিত, সমস্ত শক্তি আল্লাহ্‌রই এবং আল্লাহ্‌ শাস্তিদানে কঠোর।” (বাকারাহ্‌, আয়াত নং ১৬৫)

২. শির্ক আল-আসগর আর-রিয়াঃ (ছোট শির্ক অর্থাৎ লোক দেখানো আমল বা কার্যাদি)

যে কোন ইবাদত অথবা ধর্মীয় আমল যাহা প্রশংসা, যশ-খ্যাতি অথবা জাগতিক লাভের জন্য করা হয় তাহা এই শ্রেণীর মধ্যে শামিল।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ বলেন, “বল, (হে মুহাম্মাদﷺ)” আমিতো তোমাদের মত একজন মানুষই, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ (ওহী) হয় যে, তোমাদের উপাস্যই (ইলাহ্‌) একমাত্র উপাস্য (ইলাহ্‌) । সুতরাং যে তাহার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তাহার প্রতিপালকের ইবাদতে কাহাকেও শরীক না করে।” (সূরা কাহাফ, আয়াত নং ১১০)

৩. আস-শির্ক আল-খফী: (গোপনশির্ক) এটা আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যের অখণ্ডনীয় অবস্থার প্রতি মনের অসন্তষ্টি; সচেতনভাবে এই বলে আফসোস করতে থাকা যে, তুমি যদি এভাবে না করে অন্যভাবে করতে বা ঐভাবে চেষ্টা না করে এভাবে এভাবে করতে তাহলে অবস্থাটা আরো ভালো হতো।

মহানবী (ﷺ) বলেছেন, “মুসলিম জাতির মধ্যে গোপন শির্ক হলো রাত্রির অন্ধকারে কালো পাথরের উপর দিয়ে চলমান কালো পিঁপড়ার চাইতেও অধিক গোপন। আর এই গোপন শির্কের প্রতিকার হবে প্রতিদিন নিম্নোক্ত বাক্যে প্রার্থনা বা দু’আর দ্বারা, “হে আল্লাহ্‌! আমি সজ্ঞানে কোন শির্ক করা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি আর অজ্ঞাতসারে কৃত গুনাহের জন্য আপনার নিকট ক্ষমা চাচ্ছি।” (আহমাদ, বায়হাকী) (আদাবুল মুফরাদ, মুসনাদে আহমাদ)