উপরে শাহাদাহ অধ্যায়ের শেষাংশে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ এবং ঈমানের ছয়টি ভিত্তির বিষয় উল্লেখিত হয়েছে। একইসঙ্গে সৎকর্ম কবুল হওয়া দুইটি মৌলিক শর্তের উপর নির্ভরশীল বলা হয়েছে। যার একটি হলো, প্রত্যেকটি আমল অবশ্যই নাবীর (ﷺ) সুন্নাত মোতাবেক সম্পাদিত হতে হবে। প্রাসঙ্গিক, সুন্নাতের বিপরীতে বিদ'আত সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞানের অভাবে বহু মুসলিম ভাই-বোন তাদের আমলে বিদ'আতের অনুসরণ করেন। যেকারণে তাদের কর্ম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এটা মুসলিম সমাজে দলাদলি এবং অনৈক্যেরও প্রধান কারণ। তাই বিদ'আত সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে হাদীসের অধ্যাপক ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেবের লেখা থেকে সংশ্লিষ্ট উদ্ধৃতি নিম্নে উল্লেখিত হলো:

বিদ’আতের সংজ্ঞা: “বিদ'আত হচ্ছে ধর্মের মধ্যে নব উদ্ভাবিত রীতি বা পদ্ধতি, যা শরীয়তের রীতির মতো পালন করা হয় এবং পালনের মাধ্যমে বেশি মাত্রায় আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর সন্তুষ্টি বা সাওয়াব আশা করা হয়।” অন্য কথায়, “যে কর্ম রাসূলে আকরাম (ﷺ) বা তার সাহাবীগণ করেননি সেই কর্ম আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম হিসেবে বা সাওয়াব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে করলে তা বিদ’আত হবে।”

ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন: যদি কেউ ইসলামের মধ্যে কোনো বিদ’আত উদ্ভাবন করে এবং মনে করে যে, এই বিদ’আতটি হাসানা বা ভালো; তাহলে বুঝতে হবে যে, সে মনে করে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) খেয়ানত করেছেন, তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব ভালোভাবে পুরোপুরি পালন করেননি। কারণ আল্লাহ বলেছেন, “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম।” কাজেই সেই দিন যে বিষয় দ্বীনের অংশ ছিলো না, পরে আর কখনো তা দ্বীনের অংশ হতে পারে না। -ইমাম শাতেবী, আল-ই'তিসাম, ১/৬৪-৬৫। পরবর্তীকালে অনেক আলেম, ইমাম ও সংস্কারক বুজুর্গ এই মত অনুসরণ করেছেন।

জাগতিক বিষয়ে নব উদ্ভাবন বিদ’আত নয়: আর এক ধরনের কাজ হল মুয়ামালাত ও আদাত বা জাগতিক, পার্থিব ও স্বাভাবিক মানবীয় কর্ম, যা মূলত মানবীয় প্রয়োজনে সকল ধর্মের বা ধর্মহীন মানুষেরা করেন। ধার্মিক মানুষ হয়তো এ সকল কর্মের মধ্যেও আল্লাহর সন্তুষ্টি সন্ধান করেন। অধার্মিক মানুষেরা শুধুমাত্র জাগতিক কারণেই এ সকল কাজ করেন। সর্বাবস্থায় কর্মগুলি জাগতিক ও পার্থিব প্রয়োজনেই মূলত করা হয়। এ ধরনের জাগতিক, পার্থিব, সামাজিক কাজে বা মুয়ামালাত ও আদাত এর মধ্যে কোন বিদ’আত নেই। এ ধরনের কাজ শরীয়তের সাধারণ বিধান অনুযায়ী জায়েজ না নাজায়েজ হবে, কিন্তু এই শ্রেণীর কোন কাজকে বিদ’আত বলে আখ্যায়িত করা বাতুলতা।

উপকরণের ক্ষেত্রে উদ্ভাবন 'সুন্নাতে হাসানা' বা বিদ’আত হতে পারে: তৃতীয় এক প্রকার কর্ম যা জাগতিক ও ধর্মীয় উভয় বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। তা হল ইবাদত পালনের জাগতিক উপকরণ ও মাধ্যম। যেমন, নামাজ আদায়ের জন্য পোশাক বা স্থান, রোজার ইফতারি বা সেহরির জন্য খাদ্য, যাকাত আদায়ের জন্য মুদ্রা, হজ আদায়ের জন্য পরিবহন, ইলম শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান, উপকরণ, পদ্ধতি ইত্যাদি।

ইসলামের অন্যতম ইবাদত নামাজ বা সালাতকে আমরা বিবেচনা করি। সালাতের ইবাদত বা আল্লাহর নৈকট্য মূলক কর্মের মধ্যে সামান্যতম ব্যতিক্রম করার অধিকার মুসলিমের নেই। সুন্নাতের বাইরে কোন রীতি প্রচলন করলে তা বিদ’আত হবে। সালাতের পদ্ধতি, দোয়া, সাজদা, রুকু, কিরাআত ইত্যাদি যে কোনো বিষয়ে নতুন রীতির প্রচলন করার অধিকার কারো নেই।

পক্ষান্তরে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু আহকাম আছে যা জাগতিক বিষয়াদির সাথে সম্পর্কিত, যেমন সতর ঢাকা, পোশাক পরা, মসজিদ তৈরি করা ইত্যাদি। এ সকল বিষয়ের দুটি দিক আছে। একদিকে এগুলি সালাতের অংশ ও আল্লাহর নৈকট্য এর মাধ্যম। অন্যদিকে জাগতিক বিষয়াবলীর সাথে সম্পৃক্ত। জাগতিক দিক থেকে পোশাকের ধরন, রং, মসজিদের ধরন, উপকরণের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রশস্ততা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে পোশাকের ক্ষেত্রে যে প্রশস্ততা আছে সে বিধানের ভিতর থেকে বিভিন্ন রঙের পোশাক পরিধান করা যায়। শরীয়তের সীমার মধ্যে যে কোন উপাদানের, রঙের বা ধরনের পোশাক মুসল্লী পরিধান করতে পারেন। এক্ষেত্রে তার জাগতিক বিষয়ের স্বাধীনতা রয়েছে।

তবে যদি কেউ সুন্নাতের বাইরে কোনো নির্দিষ্ট রঙ বা নির্দিষ্ট প্রকারকে বিশেষভাবে নামাজের রীতি করে নেন এবং তাকে 'সাওয়াবের কারণ' মনে করেন বা তা ত্যাগ করাকে 'সাওয়াব কম হওয়ার কারণ' মনে করেন তাহলে বিদ’আত হবে।

যেমন সাদা, কালো, সবুজ, ইত্যাদি রঙের পোশাক নামাজের মধ্যে পরিধান করা যায়। কিন্তু কেউ যদি শুধু একটি বিশেষ রঙের পোশাককে নামাজের জন্য রীতি করে ফেলেন এবং মনে করেন সর্বদা এই রঙের পোশাক পরিধান করেই নামাজ আদায় করতে হবে এবং তাতে সাওয়াব বেশি হবে বা অন্য রঙ ব্যবহার করলে সাওয়াব কম হবে তাহলে তা বিদ’আতে পরিণত হবে। অনুরূপভাবে হজের ক্ষেত্রে যাতায়াতের মাধ্যম একটি জাগতিক উপকরণ। এক্ষেত্রে যেকোনো উপকরণ বা পদ্ধতি ব্যবহার করার সুযোগ মুসলিমের রয়েছে। কিন্তু সুন্নাত এর নির্ধারণ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট উপকরণকে আল্লাহর নৈকট্য এর মাধ্যম বা সাওয়াব কম বেশি হওয়ার কারণ মনে করলে তা বিদ’আত হবে।

ইবাদত পালনের উপাদান, উপকরণ বা মাধ্যম এর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দিক হলো, যদি যুগের পরিবর্তনে কোন ইবাদত পরিপূর্ণ সুন্নাত পদ্ধতিতে আদায়ের জন্য কোন উপাদান বা উপকরণ উদ্ভাবন করা হয় তা হলে তা 'সুন্নাতে হাসানা' বলে গণ্য হবে। যেমন, সুন্নাত পদ্ধতিতে কুরআন পাঠের জন্য বাগদাদী, নূরানী বা নাদিয়া কায়দা উদ্ভাবন করা।

অনুরূপভাবে মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রক্ষা ও সামাজিক কল্যাণ লাভের জন্য শরীয়ত-সম্মত জাগতিক উপকরণ ও উপাদান উদ্ভাবন করলেও তা 'সুন্নাতে হাসানা' বলে গণ্য হবে। যেমন স্বামী-স্ত্রীর স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার জন্য শরীয়ত সম্মত শর্তাবলী ও পদ্ধতিতে বিবাহের কাবিন রেজিস্ট্রি করার নিয়ম প্রচলন করা। সমাজ সেবা মূলক কাজ, নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বা বিভিন্ন ধরনের কর্মে রত মানুষদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য শরীয়ত সম্মত বিভিন্ন নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এগুলি কিছু বিদ’আত নয়। কারণ এগুলি ইবাদত নয়, ইবাদতকে সুন্নাত পদ্ধতিতে পালনের উপকরণ ও উপাদান মাত্র।

তবে এগুলিকে ইবাদতের অংশ হিসাবে বা সাওয়াবের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলে তা বিদ’আতে পরিণত হবে। কারণ তখন তা দ্বীনের (ধর্মের) মধ্যে উদ্ভাবন হবে। যেমন, যদি কেউ বিবাহের কাবিন রেজিস্ট্রি করাকে ইবাদতের অংশ মনে করেন বা মনে করেন যে শুধুমাত্র কাবিনের কারণে বিবাহের সাওয়াবের কমবেশি হবে বা কাবিন ছাড়া বিবাহের চেয়ে কাবিনসহ বিবাহে সাওয়াব বেশি হবে, তাহলে তা বিদ’আতে পরিণত হবে।

(সূত্র: এহইয়াউস সুনান -সুন্নাতের পুনরুজ্জীবন ও বিদ’আতের বিসর্জন)

➧ “রসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাকো।” (সূরা হাশর, আয়াত নং ৭)

➧ “যদি কেউ এমন কর্ম করে, যে ব্যাপারে আমার কোন নির্দেশ নেই, তাহলে তার সে কর্ম আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করবেন, কবুল করবেন না।” (মুসলিম ১৭-১৮, বুখারী ২৬৯৭)

➧ “আমি তোমাদের আগে হাউজে (কাউসারে) গিয়ে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবো। যে আমার কাছে যাবে, সে (হাউজ) থেকে পান করবে, আর যে পান করবে সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। অনেক মানুষ আমার কাছে (হাউজে পানি পানের জন্য) আসবে, যাদেরকে আমি চিনতে পারবো আর তারাও আমাকে চিনতে পারবে, কিন্তু তাদেরকে আমার কাছে আসতে দেয়া হবে না, বাধা দেওয়া হবে। আমি বলবো "এরা তো আমারই উম্মত।” তখন উত্তরে বলা হবে "আপনি জানেননা, এরা আপনার পরে কি সব নব উদ্ভাবন করেছিলো "। তখন আমি বলবো "যারা আমার পরে (আমার দ্বীনকে) পরিবর্তিত করেছে, তারা দূর হয়ে যাক, তারা দূর হয়ে যাক "। (বুখারী ৬৫৮৬, মুসলিম ২২৯১)

➧ “যে কাজ মুবাহ হতে পারে আবার বিদ’আতও হতে পারে সে কাজ করা যাবেনা, কারণ বিদ’আত পরিহার করা ওয়াজিব ... এবং যে কাজ সুন্নাত হতে পারে আবার বিদ’আতও হতে পারে, উভয় সম্ভাবনা রয়েছে সে কাজ করা যাবে না।” (হানাফী আলেম আল্লামা সারাখসী, মাবসূত ৩/১৯৫ [এহইয়াউস সুনান])