উপরে বর্ণিত শিরক, কুফর ও নিফাক তথা মুনাফিকের বর্ণনার সাথে সম্পর্কিত আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে সংযুক্ত করা হলো।
দশটি ‘ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ’:
উপরে বর্ণিত শির্ক, কুফর ও নিফাক তথা মুনাফিকের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সৌদি আরবের গবেষণা, ফাতাওয়া, দাওয়াত ও ইরশাদ বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ড. আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বাজের পক্ষ থেকে ‘হজ্জ ও উমরাহ -নির্দেশিকা’ পুস্তিকায় সম্মানিত হাজী সাহেবদের উদ্দেশ্যে সংক্ষেপে লিখিত দশটি ‘ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ’ পাঠকদের সদয় অবগতির জন্য (বুঝার সুবিধার্থে কিছু নোট সহ) নিম্নে সন্নিবেশিত হলো:
হে মুসলমান ভ্রাতাগণ, জেনে রাখুন, কতকগুলো কাজ ইসলামকে বিনষ্ট করে দেয়। সেগুলোর মধ্যে যে দশটি কাজ পুনঃ পুনঃ সংগঠিত হয়ে থাকে তা থেকে সতর্ক থাকবেন। সেগুলো নিম্নরূপ: -
প্রথমঃ ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকেও আল্লাহর সাথে শরীক করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করবে আল্লাহ তার জন্য বেহেশত হারাম করে দেবেন। দোজখই হবে তার ঠিকানা। অত্যাচারীদের জন্য কোন সহায়তাকারী নাই।” নিম্নলিখিত কার্যাদি আল্লাহর ইবাদতে অন্যকে শরীক করার অন্তর্ভুক্ত।
যথা-মৃত ব্যক্তিকে আহ্বান করা, তাদের কাছে বিপদ হতে উদ্ধারের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং তাদের নামে মানত ও কুরবানী করা।
দ্বিতীয়ঃ যারা নিজেদের ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যে মাধ্যম নির্বাচন করতঃ তাদেরকে আহবান করে এবং তাদের উপর ভরসা করে, তারা সর্ব সম্মতিক্রমে কাফের হয়ে যায়।
নোট: মহান আল্লাহ বলেন, ''আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ (সূরা যুমার, আয়াত নং ৩)
তৃতীয়ঃ যারা মুশরেকগণকে কাফের মনে করে না, বা তাদের কুফরীতে সন্দেহ পোষণ করে অথবা তাদের ধর্মকে সঠিক বলে বিশ্বাস করে, তারা কাফের হয়ে যায়।
চতুর্থঃ যে ব্যক্তি তাগুতের (খোদাদ্রোহী শক্তি) হুকুমকে নবী (ﷺ) এর হুকুম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর মনে করে, অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, নবী করীম (ﷺ) এর পথ প্রদর্শন অপেক্ষা অন্যের পথ প্রদর্শন অধিক সঠিক অথবা অন্যের নির্দেশ নবী করীম (ﷺ) এর নির্দেশ অপেক্ষা উন্নততর, সে ব্যক্তি কাফের। এই জাতীয় কুফরী যেমন:
(ক) মানব রচিত বিধান ও নিয়ম পদ্ধতি ইসলামী শরীয়ত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করা, অথবা একথা মনে করা যে, বর্তমান মডার্ন যুগে ইসলামী বিধান যুগোপযোগী নয়, অথবা মনে করা যে একমাত্র ইসলামই হচ্ছে মুসলমানদের পশ্চাদপদতার কারণ, অথবা মনে করা যে, ধর্ম প্রভু পরওয়ারদেগার ও মানুষের মধ্যে একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার (Private affair) । অন্যান্য ক্ষেত্রে ধর্মের প্রবেশ (entrance) নিষিদ্ধ।
(খ) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক চোরের হাত কাটা অথবা বিবাহিত ব্যভিচারীকে প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা করা আধুনিক কালে যুগোপযোগী ও যুক্তিসঙ্গত নয়, এরূপ ধারণা পোষণ করা।
(গ) এই আকীদা পোষণ করা যে, শারয়ী ব্যাপারে অথবা হোদুদ (শাস্তির নির্ধারিত সীমা) বা অন্যান্য ব্যাপারে আল্লাহর নাযিল করা বিধান ছাড়া বিচার ফয়সালা করা জায়েজ (যদিও সে বিশ্বাস করে যে, তার এই ফায়সালা শারয়ী বিধান অপেক্ষা নিকৃষ্ট) । কেননা, এর ফল দাঁড়াবে এই যে, কখনও কখনও সে অবধারিত হারাম বস্তুকে হালাল মনে করে নিবে। আর যারা নিশ্চিত হারাম বস্তু যেমন জেনা, শরাব, সুদ ইত্যাদিকে হালাল মনে করে নেয়, তারা কাফের হয়ে যায়, এতে সব মুসলমান একমত।
নোট: মহান আল্লাহ বলেন, “কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ৬৫)
আয়াতের ব্যাখ্যা: বিরোধীয় বিষয়ে রসূলের (ﷺ) মীমাংসাকে মেনে নিয়ে সে মতে কাজ করা বাদী বিবাদী উভয় পক্ষের উপর ফরয। তাঁর তিরোধানের পর তাঁর পবিত্র শরীয়তের মীমাংসাই হলো তাঁর মীমাংসা যা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। (তাফসীরে আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)
পঞ্চমঃ হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) এর আনীত শারয়ী বিধানের কোন কিছুর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি কাফের, যদিও সে উক্ত বিধানের উপর অসন্তুষ্ট চিত্তে আমল করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'এটা এজন্যে যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দেবেন। (সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত নং ৯)
নোট: যেমন- ইসলামী বিধানের আযান, পর্দা, দাঁড়ি, টুপি, দণ্ডবিধি, শিক্ষা, রাজনীতি ইত্যাদি।
ষষ্ঠঃ শরীয়তে মুহাম্মদীর কোন অনুশাসন অথবা তার জন্য নির্ধারিত সাওয়াব বা শাস্তিকে যে বিদ্রুপ করবে, সে আল্লাহ পাকের বাণী অনুযায়ী কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তুমি বলো, তোমরা কি ঠাট্টা তামাশা করছিলে আল্লাহ ও তাঁর আয়াতগুলো এবং তার রসূল সম্বন্ধে? এখন আর কৈফিয়ৎ পেশ করোনা। তোমরা নিজেদের ঈমান প্রকাশ করার পরও তো কুফরী কাজে লিপ্ত ছিলে।” (সূরা তাওবা, আয়াত নং ৬৫-৬৬)
নোট: ঠাট্টা তামাশা মৌখিকভাবে, ইঙ্গিতে, লিখনি বা কার্টুনের মাধ্যমেও হতে পারে।
সপ্তমঃ যাদু, যাদুর দ্বারা বিকর্ষণ করা, যেমন কোন মানুষকে যাদুর দ্বারা তার প্রেয়সী স্ত্রীর প্রতি বিরাগ ভাজন করা। যাদুর আকর্ষণ, যেমন শয়তানি মন্ত্রণা দ্বারা অপছন্দনীয় কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান। সুতরাং যে ব্যক্তি এটা সম্পাদন করে অথবা এতে সন্তুষ্ট থাকে সে আল্লাহর কালাম অনুযায়ী কাফের হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তারা কাউকে কিছু শিক্ষা দেয়ার পূর্বেই অবশ্য বলে দিত যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ। সুতরাং তোমরা কুফরি করো না।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১০২)
অষ্টমঃ মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকগণকে সাহায্য করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে তারা তাদের মধ্যেই পরিগণিত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অত্যাচারী জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা মায়েদা, আয়াত নং ৫১)
নোট: যেমন- চুক্তি করে মুসলিমদের দমন ও মুশরিকদের লালন, মুসলিম লেখকের লিখা বাদ দিয়ে মুশরিক লেখকের লেখা পাঠ্যক্রমে সংযোজনসহ নানাভাবে তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা।
নবমঃ যদি কেউ বিশ্বাস পোষণ করে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিধান হতে বের হয়ে যাওয়া কোন কোন লোকের জন্য বৈধ, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীনের আশ্রয় নিতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না, এবং সে হবে পরলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৮৫)
নোট: মহান আল্লাহ বলেন, “আর আপনার মৃত্যু আসা পর্যন্ত আপনি আপনার রবের ইবাদাত করুন।” (সূরা হিযর, আয়াত নং ৯৯)
আয়াতের ব্যাখ্যা: যারা মনে করে হাকীকতে পৌঁছে গেছে, তাদের মন ঠিক আছে, কাজেই শরীয়তের বিধান, নামাজ -রোজার প্রয়োজন নাই, ওগুলো সাধারণ মুসলমানের জন্য। এসবই ভণ্ডামি ও কুফরী কাজ।
দশমঃ আল্লাহর দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া অথবা যেসব বস্তু ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না, সে সব বস্তু সম্পর্কে অনবহিত থাকা এবং তার উপর আমল না-করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নির্দেশনাবলী দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরায় তার অপেক্ষা অধিক সীমা লঙ্ঘনকারী আর কে? আমি অপরাধীদিগকে শাস্তি দিয়ে থাকি।” (সূরা আস সাজদাহ, আয়াত নং ২২)
আল্লাহ আরও বলেছেন, “আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তারা তা অবজ্ঞা ভরে অস্বীকার করে।” (সূরা আহকাফ, আয়াত নং ৩)
ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, ভয়ে হোক, ভীতিতে হোক, যদি কোন ব্যক্তি উল্লিখিত ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়ের কোন একটি সম্পাদন করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। হ্যাঁ, যদি কোন ব্যক্তিকে জবরদস্তিমূলকভাবে উক্ত কাজ করানো হয়, তবে সে এই হুকুমের আওতায় পড়বে না।
নোট: মহান আল্লাহ বলেন, “আর যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকবে, নিশ্চয় তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমরা তাকে কিয়ামতের দিন জমায়েত করব অন্ধ অবস্থায়।” (সূরা ত্বহা, আয়াত নং ১২৪)
আয়াতের ব্যাখ্যা: উক্ত আয়াতে স্মরণ বলতে কুরআন বোঝানো হয়েছে। এবং সংকীর্ণ জীবন যাপন বলতে দুনিয়া এবং কবরের জীবনকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)
*এখানে হজ্ব ও উমরাহ -নির্দেশিকা বইয়ের উদ্ধৃতি শেষ।