তাওহীদ-আল-উলুহিয়্যাহ বুঝার জন্য সংশ্লিষ্ট আয়াত (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাসহ) নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

➧ “আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।” (সূরা যারিয়াত, আয়াত নং ৫৬)

ইবাদতের সংজ্ঞা: সেই সব গুপ্ত বা প্রকাশ্য কথা ও কাজ যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়ে এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও ভালবাসা অর্জনের জন্য করা হয়। অন্য কথায়-ইবাদত প্রত্যেক সেই গুপ্ত ও প্রকাশ্য কথা ও কাজের নাম, যা আল্লাহ পছন্দ করেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। -সুত্রঃ তাফসীর আহসানুল বায়ান, সূরা ফাতেহার ৫ নং আয়াত

➧ “তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ্ নেই। কাজেই তোমরা তাঁকেই ডাক, তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই।” (সূরা মুমিন, আয়াত নং ৬৫)

➧ “আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম কর।” (সূরা ত্বহা, আয়াত নং ১৪)

➧ “আর তোমাদের ইলাহ্‌ এক ইলাহ্‌, দয়াময়, অতি দয়ালু তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ্‌ নেই।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৬৩)

➧ “আল্লাহ্‌, তিনি ব্যতীত কোন প্রকৃত ইলাহ্‌ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ২)

ব্যাখ্যাঃ حَيٌّ এবং قَيُّومٌ মহান আল্লাহর বিশেষ গুণ। 'হায়্যুন'এর অর্থ তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু ও ধ্বংস নেই। 'ক্বায়্যুম'এর অর্থ, তিনি নিখিল বিশ্বের ধারক, সংরক্ষণকারী এবং পর্যবেক্ষক। (তাফসীর আহসানুল বায়ান, সংক্ষেপিত)

আদম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত যত নবী ও রাসূল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষায় এবং বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং সবাই একই বাণী উচ্চারণ করেন। তাদের অধিকাংশেরই পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ পর্যন্ত হয়নি। তাদের আবির্ভাবকালে গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনার আমলও ছিল না যে, এক রাসূল অন্য রাসূলের গ্রন্থাদি ও রচনাবলী পাঠ করে তার দাওয়াতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবেন; বরং তাদের একজন অন্যজন থেকে বহুদিন পরে জন্মগ্রহণ করেছেন। জাগতিক উপকরণাদির মাধ্যমে পূর্ববর্তী রাসূলগণের কোন অবস্থা তাদের জানা থাকারও কথা নয়। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে ওহী লাভ করেই তারা পূর্বসুরীদের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হন এবং আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকেই তাদেরকে এ দাওয়াত প্রচার করার জন্য নিযুক্ত করা হয়। এখন যে ব্যক্তি ইসলাম ও তাওহীদের দাওয়াতের প্রতি মনে মনে কোনরূপ বৈরীভাব পোষণ করে না, সে যদি খোলা মনে সরলভাবে চিন্তা করে, তবে এত বিপুল সংখ্যক নবী-রাসূল বিভিন্ন সময় এক বিষয়ে একমত হওয়াই বিষয়টির সত্যতা নিরূপণের জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু রাসূলগণের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, তাদের সততা ও সাধুতার উচ্চতম মাপকাঠির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কারো পক্ষে এরূপ বিশ্বাস করা ছাড়া গত্যন্তর নেই যে, তাদের বাণী ষোল আনাই সত্য এবং তাদের দাওয়াতে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেরই মঙ্গল নিহিত। [তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন] (তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া সংক্ষেপিত )

➧ “তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ্‌ নেই; (তিনি) প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৬)

➧ “আল্লাহ্‌ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহ্‌ও নেই; যদি থাকতো তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতো। তারা যে গুণে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে আল্লাহ্‌ কত পবিত্র-মহান!” (সূরা মুমিনুন, আয়াত নং ৯১)

➧ “আপনি কি দেখেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যারা আছে তারা এবং সারিবদ্ধভাবে উড্ডীয়মান পাখীরা আল্লাহ্‌র পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তার ‘ইবাদতের ও পবিত্রতা-মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি। আর তারা যা করে সে বিষয় আল্লাহ্‌ সম্যক অবগত।” (সূরা নূর, আয়াত নং ৪১)

ব্যাখ্যা: পৃথিবী ও আকাশবাসীরা যেভাবে আল্লাহর আদেশ পালন ও তাঁর মহিমা বর্ণনা করে, সব কিছুই তাঁর জ্ঞানায়ত্তে রয়েছে। এ কথা বলে যেন মানব-দানবকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমাদেরকে আল্লাহ বিবেক ও ইচ্ছার স্বাধীনতা দান করেছেন। অতএব আল্লাহর মহিমা, প্রশংসা ও আনুগত্য অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় তোমাদেরকে বেশী করা উচিত। কিন্তু বাস্তব তার বিপরীত। অন্য সৃষ্টিরা আল্লাহর মহিমা-গানে ব্যস্ত থাকে; কিন্তু বিবেক ও ইচ্ছাশক্তি দ্বারা সুশোভিত সৃষ্টি এতে অলসতার শিকার। যার কারণে তারা অবশ্যই আল্লাহর পাকড়াও-যোগ্য। (তাফসীরে আহসানুল বায়ান, সংক্ষেপিত)

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু কিভাবে তাওহীদের সকল প্রকারকে অন্তর্ভূক্ত করে?

উত্তর: “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এই পবিত্র বাক্যটি তাওহীদের সকল প্রকারকে অন্তর্ভূক্ত করে। কখনো প্রকাশ্যভাবে আবার কখনো অপ্রকাশ্যভাবে। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার সাথে সাথে বাহ্যিকভাবে তাওহীদ উলুহিয়্যাতকেই বুঝায়। তবে তা তাওহীদে রুবুবিয়্যাতকেও শামীল করে। কেননা যারা আল্লাহর ইবাদত করে তারা আল্লাহর রুবুবিয়াতকে স্বীকার করে বলেই তা করে থাকে। এমনিভাবে তাওহীদে আসমা ওয়াস্সিফাতকেও অন্তর্ভূক্ত করে। কারণ যার কোন ভাল নাম ও গুনাবলী নাই মানুষ কখনই তার ইবাদত করতে রাজি হবে না। এই জন্যই ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বলেছেনঃ ‘হে আমার পিতা! যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসেনা, তার ইবাদত কেন কর? (সূরা মারইয়াম, আয়াত নং ৪২) (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, সালিহ আল-উসাইমান।)