১. যুলুম বা অত্যাচার করা (অর্থাৎ -অন্যায়ভাবে কাহারো আর্থিক, দৈহিক ও সম্মান-মর্যাদার ক্ষতি সাধন করা):
➧ “সাবধান! অত্যাচারীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ।” (সূরা হূদ, আয়াত নং ১৮)
➧ “অতঃপর যে উপদেশ তাদেরকে দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলে গেল, তখন যারা অসৎকাজ থেকে নিষেধ করত তাদেরকে আমরা উদ্ধার করি। আর যারা যুলুম করেছিল তাদেরকে আমরা কঠোর শাস্তি দেই, কারণ তারা ফাসেকী করত।” (সূরা আরাফ, আয়াত নং ১৬৫)
➧ “অত্যাচারীরা তাদের অত্যাচারের পরিনতি সহসাই জানতে পারবে।” (সূরা শুয়ারা, আয়াত নং ২২৭)
➧ “যালিমদের জন্য কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং এমন কোন সুপারিশকারীও নেই যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে।” (সূরা গাফির, আয়াত নং ১৮)
➧ “নিশ্চয় যারা বিশ্বাসী নর-নারীকে নিপীড়ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি ও দহন যন্ত্রণা।” (সূরা বুরুজ, আয়াত নং ১০)
➧ “আল্লাহ জালেমকে সুদীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন (তার সংশোধন/তওবার জন্য) । অবশেষে যখন পাকড়াও করেন, তখন তাকে আর রেহাই দান করেন না।” (বুখারী, মুসলিম)
➧ তোমরা অত্যাচার করা থেকে সাবধান থাক। নিশ্চয়ই অত্যাচার কিয়ামতের দিন হবে অন্ধকার স্বরূপ (বিশেষ করে পুলসিরাত অতিক্রমের সময়) । -মুসলিম ২৫৭৮, মিশকাত ১৮৬৫
➧ খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ হতে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মানুষকে সবচেয়ে বেশি শাস্তি বা কষ্ট দেয়, কিয়ামতের দিন সে সবচেয়ে বেশি আযাব ভোগ করবে। -আহমাদ ১৬৮১৯, বাইহাকী ৫৩৫৬, সহীহুল জামে, ৯৯৮
➧ যে ব্যক্তি এমন জিনিস দাবী করে যা তাঁর নয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সে যেন জাহান্নামে তাঁর বাসস্থান বানিয়ে নেয়। -বুখারী, মুসলিম, আহমদ, ইবনে মাজাহ।
➧ ইবনে উমার রাঃ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচাইতে বড় পাপী সেই ব্যক্তি যে এক মহিলাকে বিবাহ করার পর তার নিকট থেকে তার প্রয়োজন মিটিয়ে নিয়ে তাকে তালাক দেয় এবং তার মোহর আত্মসাৎ করে নেয় | দ্বিতীয় হল সেই ব্যক্তি, যে একটি লোককে কাজে খাটিয়ে তার মজুরী আত্মসাৎ করে নেয় | আর তৃতীয় সেই ব্যক্তি যে খামোখা প্রাণী হত্যা করে | -হাকিম ২৭৪৩, বায়হাকী ১৪৭৮১, সহীহুল জামে ১৫৬৭
➧ আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত নবী (ﷺ) বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, তিন প্রকার লোক এমন আছে কিয়ামতের দিন যাদের প্রতিবাদী স্বয়ং আমি; ১) সে ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো, পরে তা ভঙ্গ করলো। ২) সে ব্যক্তি, যে স্বাধীন মানুষকে (প্রতারণা দিয়ে) বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করল। ৩) সে ব্যক্তি, যেকোনো মজুরকে খাটিয়ে তার নিকট থেকে পুরোপুরি কাজ নিল। কিন্তু তার মজুরী দিল না। -বুখারী ২২২৭,২২৭০
আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, “লোকেরা যখন দেখলো, অত্যাচারী অত্যাচার করছে, এরপর তারা এর প্রতিরোধ করলো না, এরূপ লোকদের উপর আল্লাহ্ অচিরেই মহামারী আকারে শাস্তি পাঠাবেন।” সুত্রঃ আবু দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, রিয়াদুস সালেহীন হা/১৯৭
যুলুমের প্রতিকার ও প্রতিরোধে আসমানি দিক নির্দেশনা (হিদায়াত)
➧ আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘তুমি তোমার অত্যাচারিত এবং অত্যাচারী ভাইয়ের সাহায্য কর’। বলা হল, (হে আল্লাহর রসূল (ﷺ)!) অত্যাচারীকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, ‘তাকে অত্যাচার করা হতে বিরত রাখবে; তাহলেই তাকে সাহায্য করা হবে’। (আহমাদ ১১৯৪৯, বুখারী ৬৯৫২, তিরমিযী ২২৫৫, সহীহুল জামে ১৫০২)
➧ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন খারাপ কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিহত করে, তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে মুখ দ্বারা প্রতিহত করবে (উপদেশ, ভীতি প্রদর্শন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে অবগত করার মাধ্যমে), আর যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। এটাই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘এর পরে সরিষা পরিমাণ ঈমানও বাকী নেই। [মুসলিম ৪৯, আবু দাউদঃ ১১৪০]
➧ আর এভাবেই জালেমদের কৃতকর্মের ফলে তাদের এককে অপরের বন্ধু বানিয়ে দেয় (একে অপরের উপর প্রবল করে দেয় - তাফসির আহসানুল বায়ান) | (সূরা আন'আম ১২৯)
ব্যাখ্যাঃ যাতে তারা একে অপরের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায় আর আমি তাদের অত্যাচার দুষ্টামি এবং বিদ্রোহের প্রতিফল একে অপরের দ্বারা একে অপরের দ্বারা প্রদান করিয়ে থাকি | (তাফসীর ইবনে কাসির সংক্ষিপ্ত)
➧ যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করবে আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দিবে আল্লাহ তাকে কষ্ট দিবেন | (ইবনে মাজাহ ২৩৪২)
➧ খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ কর্তৃক বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে একজন বেদুইন ব্যক্তির অনেক প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্ন "হে আল্লাহর রাসূল সাঃ, আমি সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ হতে চাই ।" নবী সাঃ বললেন, "নিজের জন্য যা কামনা/পছন্দ কর, মানুষের জন্যও তা-ই কামনা করবে, তবেই তুমি সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ হতে পারবে ।" - তানজুল উম্মাল
➧ দুইটি গুন্ যার মধ্যে থাকবে সে বিনা হিসাবে শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে । ১) আল্লাহ ও পরকালে দৃঢ় বিশ্বাস, ২) নিজের জন্য আচরণ পছন্দ করবে অন্যের সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করবে । - মুসলিম ৪০৩০, মা শামেলা ৪৬৭০, আহমাদ ৬৮০৬
➧ অন্য এক হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ করে বলছি, অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। নতুবা অচিরেই আল্লাহ তোমাদের উপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি নাযিল করবেন। তারপর তোমরা অবশ্যই তাঁর কাছে দো’আ করবে, কিন্তু তোমাদের দোআ কবুল করা হবে না। [তিরমিযীঃ ২১৬৯, মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৩৯১]
➧ অনুরূপভাবে রসূল (ﷺ) কে এক লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্র রসূল, কোন লোক সবচেয়ে বেশী ভাল? তিনি বললেনঃ সবচেয়ে ভাল লোক হল যে আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন করে, সৎকাজে আদেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৬/৪৩১]
➧ কেউ মন্দ কাজ করলে সে কেবল তার কর্মের অনুরূপ শাস্তি পাবে (অর্থাৎ, যতটা পাপ করেছে, ঠিক ততটাই শাস্তি পাবে, তার বেশী পাবে না) । সূরা গাফির – ৪০
➧ সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর। -সূরা মায়িদাঃ ২
➧ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কারো যুলুমমূলক মামলায় সহযোগিতা করে অথবা যুলুমে সহায়তা করে, তা থেকে নিবৃত্ত না হওয়া পর্যন্ত সর্বদাই সে আল্লাহর গযবে নিপতিত থাকে। -ইবনে মাজাহঃ ২/২৩২০
➧ আর আল্লাহ্ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন তবে পৃথিবী বিপর্যস্ত হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ্ সৃষ্টিকুলের প্রতি অনুগ্রহশীল। -সূরা বাকারাহঃ ২৫১
উক্ত আয়াত যালেমদের জন্য মহা সতর্কবাণী। আল্লাহর এ বিধান মানব সমাজে কার্যকর রয়েছে।
➧ আর যারা যুলুম করেছে, তোমরা তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়োনা (জালেমদের সাথে বন্ধুত্ব, আনুগত্য, সমর্থন ও চাটুকারিতার মাধ্যমে সহযোগী হয়ো না), পড়লে আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে। -সূরা হূদ: ১১৩
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, যে স্থানে কোন মানুষকে অন্যায়ভাবে নির্যাতন বা হত্যা করা হয়, তোমরা সে স্থানে থেকো না। কেননা যারা এ স্থানে অবস্থান করে এবং যুলুম প্রতিহত করে না, তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হয়ে থাকে। -তিবরানী শরীফ
নোট: অতএব ক্ষমতানুযায়ী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তি যদি হাতের দ্বারা বা মুখের কথা দ্বারা জালেমকে বাধা না দিলে এবং মজলুমকে সাহায্য না করলে আল্লাহর অভিসম্পাত নাযিল হয়, তাহলে যে ব্যক্তি স্বয়ং যুলুম করে তার কি পরিনতি হতে পারে?
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি কোন জালেমকে সাহায্য করবে তার ওপর কোন না কোন জালেমকে চাপিয়ে দেয়া হবে।” সূত্র–যয়ীফ, সিলসিলাহ যয়ীফা, ১৯৩৭
➧ যে ব্যক্তি কোন জালেমকে জালেম জেনেও তার পক্ষ নেবে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে। -যয়ীফ, সিলসিলাহ যয়ীফা
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সেই বান্দাই মর্যাদায় নিকৃষ্ট সাব্যস্ত হইবে, যে অন্যের পার্থিব কল্যাণে নিজের আখিরাত ধ্বংস করিয়াছে। -যয়ীফ ইবনে মাজাহ
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ, কোন অত্যাচারী যালিমের কাজে সাহায্য করিয়াছে। অথবা অন্যায়ভাবে কাহারো পার্থিব উপকারে সাহায্য করিয়াছে।
** উপরের তিনটি হাদীস যয়ীফ হলেও তা কুরআনের উপরোক্ত আয়াতের সমার্থক।
➧ আবু হুরায়রা রাঃ কর্তৃক বর্ণিত একদা মহানবী (ﷺ) বললেন, তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? সাহাবাগণ বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যার কোন দিরহাম নেই, যার কোন আসবাব-পত্র নেই। মহানবী (ﷺ) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতে নামায রোযা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সেইসঙ্গে সে দেখবে যে, সে একে গালি দিয়েছে, ওর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, এর মাল আত্মসাৎ করেছে, ওকে খুন করেছে, একে মেরেছে ইত্যাদি। সুতরাং প্রতিশোধ স্বরূপ একে নিজের নেকি দান করবে, ওকে নিজের নেকি দান করবে পরিশেষে যখন নিঃশেষ হয়ে যাবে অথচ তার প্রতিশোধ শেষ হবে না, তখন ওদের গোনাহ নিয়ে এর ঘাড়ে চাপানো হবে এবং সবশেষে তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। মুসলিম ৬৭৪৪, আহমদ ৮০২৯, তিরমিজি ২৪১৮, ইবনে হিব্বান ৪৪১১, বায়হাকী ১১৮৩৮, সিলসিলা সহীহা ৮৪৭।
➧ আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, দু’ব্যক্তি যখন গালমন্দে লিপ্ত হয়, তখন তাদের উভয়ের গুনাহ তার উপরই বর্তাবে, যে প্রথমে শুরু করে। যতক্ষণ না অত্যাচারিত সীমালঙ্ঘন করে। -মুসলিম, ইফাঃ ৬৩৫৫
২. হারাম উপার্জন করা:
➧ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, কারো পক্ষে অন্যের সম্পদ তার আন্তরিক তুষ্টি ব্যতীত গ্রহণ করা হালাল হবে না। -মুসনাদে আহমদ ৩/৪২৩
এ হাদীসটি এমন একটা মূলনীতির নির্দেশ দেয়, যা সর্বপ্রকার প্রাপ্য ও লেন -দেনের ব্যাপারে হালাল এবং হারামের সীমারেখা নির্দেশ করে। সূত্রঃ তাফসীর আবু বকর জাকারিয়া; সূরা নিসা আয়াত নং-৪
➧ যেই দেহের গোশত হারাম (অবৈধ) মালে গঠিত, উহা বেহেশতে প্রবেশ করিতে পারিবে না। হারাম মালে গঠিত দেহের জন্য দোযখই সমীচিন। -মুসনাদে আহমেদ, বায়হাকী, দারেমী ও মেশকাত শরীফ।
➧ দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। -সূরা মুতাফফিফিন ১-৩
➧ তারা যখনই তাদের পরিমাপের পাত্রে এবং দাঁড়িপাল্লায় কম দিবে তখনই তাদেরকে দুর্ভিক্ষ গ্রাস করবে | সিলসিলা সহিহা হা/১০৬, জয়ীফ হাদিস সিরিজ ৩য় খন্ড পৃষ্ঠা ৩১৮
➧ নিশ্চয় যারা ইয়াতীমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তো তাদের পেটে আগুনই খাচ্ছে; তারা অচিরেই জ্বলন্ত আগুনে জ্বলবে। -সূরা নিসা ১০
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, যে জাতিই মাপ ও ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে। -ইবনে মাজাহ হা/৫০১৯, সিলসিলাহ সহীহাহ হা/১০৬
➧ নবী (ﷺ) বলেন, নিশ্চয়ই চাঁদাবাজ জাহান্নামে যাবে। -আহমাদ হা/১৭০০১, তাবারানী হা/৪৩৬৬, সিলসিলাহ সহীহাহ হা/৩৪০৫
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, এমন অনেক লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সম্পদের (জনগণের অর্থ-সম্পদের) মধ্যে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করে। কিয়ামতের দিন তাদের জন্য জাহান্নামের আগুন নির্ধারিত রয়েছে। -বুখারী
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেন, ব্যবসায়ীরাই ফাজের (পাপাচারী) । সাহাবাগন বললেন, আল্লাহ কি ব্যবসাকে হালাল করেননি? তিনি বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তারা কসম করে পাপ করে এবং কথা বলতে মিথ্যা বলে। -আহমাদ হা/১৫৬৬৯, হাকেম হা/২১৪৫, সহীহ তারগীব হা/১৭৮৬
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন ফাজের (পাপাচারী) হয়ে (কবর থেকে) উঠবে। তবে সে নয়, যে (তার ব্যবসায়) আল্লাহকে ভয় করে, (লোকদের প্রতি) এহসান করে এবং সত্য কথা বলে। -তিরমিযী হা/১২১০, হাকেম হা/২১৪৪, সিলসিলাহ সহীহাহ হা/৯৯৪
➧ আবু যার রাঃ থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের প্রতি তাকিয়েও দেখবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তিনি এ কথাটি পুনঃ পুনঃ তিনবার বললেন। আমি বললাম, ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্থ হবে, তারা কারা হে আল্লাহর রসূল? তিনি বললেন, তারা হল, যে ব্যক্তি গাঁটের নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরে, দান করে যে “দিয়েছি দিয়েছি” বলে প্রচার করে বেড়ায় এবং মিথ্যা কসম (যা স্পষ্ট প্রতারণা) করে যে তার পন্যদ্রব্য বিক্রয় করে। -মুসলিম হা/৩০৬-৩০৭, আবু দাউদ হা/৪০৮৭, তিরমিযী হা/১২১১, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ হা/২২০৮
➧ আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। চালবাজ ও প্রতারক (ব্যক্তিগত লাভের জন্য যা সঠিক নয় তা সত্য বলে কাউকে ধারণা দেয়া) জাহান্নামে যাবে। (তাবারানীর কাবীর হা/১০০৮৬ ও সাগীর হা/৭৩৮, ইবনে হিব্বান হা/৫৬৭, ৫৫৫৯, সাহীহুল জামে’ হা/৬৪০৮)
➧ উবায়দ ইবনে রিফায়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা হযরত রিয়াফা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, “আল্লাহ্-ভীরু নেককার ও সৎ ব্যবসায়ী ছাড়া সকল ব্যবসায়ীকে বদকার হিসেবে কিয়ামতের দিন উঠানো হবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ, দারেমী, মারিফুল হাদীস হা/১৯৯)
➧ বুরাইদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, “যাকে আমরা বেতন দিয়ে কর্মচারী নিযুক্ত করেছি, সে যদি তার পরেও কোনো কিছু গ্রহণ করে, তাহলে তা হবে খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) ।” (আবু দাঊদ হা/২৯৪৫, হাকেম হা/১৪৭২, সহীহুল জামে হা/৬০২৩)
➧ “আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৮৮)
হারাম উপার্জনের প্রতিকারে ও প্রতিরোধে আসমানি হিদায়াত:
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, জিবরাঈল আঃ আমার অন্তরে এই কথাটি ঢালিয়া দিয়াছেন যে, কোন দেহ তাহার (নির্ধারিত) রিযিক পরিপূর্ণভাবে ভোগ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করিবে না। সাবধান! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং মাল-সম্পদ উপার্জনেউত্তম নীতি অবলম্বন কর (অর্থাৎ, বৈধভাবে হাসিল কর) । কাঙ্ক্ষিত রিযিক পৌঁছার বিলম্বতা যেন তোমাদিগকে আল্লাহর নাফরমানীর পথে উহা অন্বেষণে উদ্বুদ্ধ না করে। কেননা আল্লাহর কাছে যাহা নির্ধারিত রিযিক আছে তাহা আল্লাহর আনুগত্য ব্যতীত অর্জন করা যায় না। (শরহে সুন্নাহ, বায়হাকী শ’আবুল ঈমান, মেশকাত ৫০৭০, সহীহ)
নোট: উক্ত হাদীস থেকে জানা যায়, নির্ধারিত রিযিকের শেষ লোকমাও মানুষ ভোগ করবে। তাহলে অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ তার কি উপকারে আসবে? নিশ্চয়ই তা মৃত্যুর মাধ্যমে তার হাতছাড়া হয়ে যাবে। অথবা রোগ-ব্যধি, বিপদ-মুসিবত, দুর্ঘটনা বা মামলা মোকদ্দমার মাধ্যমে অর্থাৎ কষ্ট ক্লেশের মাধ্যমে হাতছাড়া হয়ে যাবে – অনেকটা লেবু চিপে বিচি বের করার মত অবস্থা হবে। তৎসঙ্গে তার উপর বর্তাবে হারাম উপার্যন ভক্ষনের পাপের বোঝা এবং জুটবে প্রতিবেশী ও পরিচিতজনের ঘৃণা ও ধিক্কার।
➧ আবু হুরায়রা রাঃ কর্তৃক বর্ণিত একদা মহানবী (ﷺ) বললেন, তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? সাহাবাগণ বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যার কোন দিরহাম নেই, যার কোন আসবাব-পত্র নেই। মহানবী (ﷺ) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতে নামায রোযা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সেইসঙ্গে সে দেখবে যে, সে একে গালি দিয়েছে, ওর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, এর মাল আত্মসাৎ করেছে, ওকে খুন করেছে, একে মেরেছে ইত্যাদি। সুতরাং প্রতিশোধ স্বরূপ একে নিজের নেকি দান করবে, ওকে নিজের নেকি দান করবে পরিশেষে যখন নিঃশেষ হয়ে যাবে অথচ তার প্রতিশোধ শেষ হবে না, তখন ওদের গোনাহ নিয়ে এর ঘাড়ে চাপানো হবে এবং সবশেষে তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম ৬৭৪৪, আহমদ ৮০২৯, তিরমিজি ২৪১৮, ইবনে হিব্বান ৪৪১১, বায়হাকী ১১৮৩৮, সিলসিলা সহীহা ৮৪৭)
➧ আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, ১) আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা থেকে বেঁচে থাক, এতে তুমি হবে উত্তম ইবাদতকারী। ২) আল্লাহ তোমার কিসমতে যা বণ্টন করেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে, এতে তুমি হবে সর্বাপেক্ষা ধনবান। ৩) তোমার প্রতিবেশীর সাথে সৎ ব্যবহার করবে, এতে তুমি হবে পূর্ণ ঈমানদার। ৪) নিজের জন্য যা পছন্দ কর, মানুষের জন্যও তা পছন্দ করবে, তখন তুমি হবে পূর্ণ মুসলমান। এবং ৫) অধিক হাসবে না। কেননা, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে। -আহমাদ, তিরমিযী সহীহ
নোট: উপরোক্ত সহীহ হাদীসে উত্তম ইবাদতকারী হতে হারাম বা নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকার শর্তারোপ করা হয়েছে। অথচ বাস্তব জীবনে দেখা যায় অনেক নামাজী রোজাদার ব্যক্তি (যারা নিজেকে দ্বীনদার পরহেজগার মনে করেন) মিথ্যাচার, প্রতারণা, সুদ খাওয়া সহ অবৈধ উপার্জন, আত্নসাৎ, ওয়াদা-অঙ্গীকার ভঙ্গ ও অন্যের সম্মানহানি সহ নানাবিধ মহা পাপাচারে লিপ্ত। কিন্তু শরীয়তের নফল মুস্তাহাব ও সুন্নতের মত কম গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পাদনে খুবই একনিষ্ঠ। এ আচরণ কলেরা ডায়রিয়ার মত জীবননাশী ব্যধিকে গুরুত্ব না দিয়ে সর্দি কাশির মত অসুখে পেরেশান হওয়ার মতই নির্বুদ্ধিতা। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, দুনিয়া আখিরাতে অশান্তি ও মারাত্মক অশুভ পরিনামের কারণ ওইসব মহাপাপের সংজ্ঞা প্রকৃতি ও বিবরণ সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন স্তরেই তা শিক্ষাদানের কোন ব্যবস্থা নাই। সেকারনে বিবেকপ্রসূত অস্পষ্ট সাধারন জ্ঞান ছাড়া উচ্চ ডিগ্রী বা পদবিধারী ব্যক্তিরাও এ ব্যাপারে অজ্ঞতাহেতু মহাপাপে লিপ্ত হয়ে পড়ছেন। পরিনামে দুনিয়াতেই নানাবিধ বিপর্যয়ের (জেল-জরিমানা সহ) শিকার হচ্ছেন। এমনকি নিজেকে পরিবার ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে ধিকৃত হচ্ছেন যা পারলৌকিক অশুভ পরিনামেরও লক্ষণ (হাদীসের বর্ণনা মতে) ।
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। (ইবনে মাজাহ ২৩১৩, তিরমিযী ১৩৩৭, আবু দাউদ ৩৫৮২)
➧ আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাঃ বলেন, রসূল (ﷺ) এর গণিমতের মালের এক ব্যক্তি দায়িত্তশীল ছিল, যে কারকারা নামে পরিচিত। সে মারা গেলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে জাহান্নামী বলে ঘোষণা করেন। সাহাবীগন তার নিকট গিয়ে দেখলেন, সে একটি চাদর আত্মসাৎ করেছিল। -বুখারী ৩০৭৪, ইবনে মাজাহ ২৮৪১, মিশকাত ৩৯৯৮
➧ নবী (ﷺ) বলেছেন, দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে কোন ছাগপালে ছেড়ে দিলে তারা ছাগলের যতটা বিনাশ সাধন করে তার চাইতেও ধনলোভ ও খ্যাতিলোভ মানুষের দ্বীনের অধিক বিনাশ সাধন করে। -তিরমিযী ২৩৭৬, ইবনে হিব্বান ৩২১৮, সহীহুল জামে’ ৫৬২০
নোট: অর্থাৎ মানুষের সকল প্রকার অবৈধ উপার্জনের মূল কারণ বা চালিকাশক্তি হলো সম্পদের এবং খ্যাতি ও ক্ষমতার লালসা। অথচ ক্ষণকাল পরেই তার মৃত্যুতে ওইসব সম্পদ ও ক্ষমতা-খ্যাতি তার কি উপকারে আসবে?
আর এ কথা বিদিত যে, আল্লাহ ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক পাপের চাইতে বান্দা ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক পাপ বেশি গুরুতর। হক ফিরিয়ে না দিলে অথবা ক্ষমা চেয়ে না নিলে বান্দার তওবাও কবুল হয় না। পরিশেষে শেষ বিচারের দিন নেক আমলের ভাণ্ডার থেকে তার খেসারত দিতে হয়।
এই জন্য সুফিয়ান সাওরী বলেছেন, তুমি ও বান্দার মাঝের হক বিষয়ক ১টি পাপ নিয়ে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার সাথে সাক্ষাৎ করার চাইতে তুমি ও তাঁর মাঝের হক বিষয়ক ৭০টি পাপ নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করা অধিক সহজ।
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, যে কোন বান্দা হারাম উপায়ে উপার্জিত অর্থ দান খয়রাত করলে তা কবুল হবে না। এবং উহা নিজ কাজে ব্যয় করলে বরকত (কল্যান, সমৃদ্ধি) ফলোদয় হবে না। আর ঐ ধন তার উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে গেলে তা তার জন্য দোযখের পুঁজি হবে। আল্লাহ তায়ালা মন্দের দ্বারা মন্দ কাটেন না (অর্থাৎ হারাম মাল দান করায় গুনাহ মাফ করেন না) – হাঁ – ভালো দ্বারা মন্দ কেটে থাকেন (অর্থাৎ হালাল মাল দান করায় গুনাহ মাফ করেন) । খারাপ খারাপকে বিদূরিত করতে পারে না। -মুসনাদে আহমাদ, মেশকাত ২৬৫১ (যয়ীফ)
➧ তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না; হলে তুমি তিরস্কৃত ও অনুতপ্ত (নিঃস্ব) হয়ে পড়বে। -সূরা বনী ইসরাইলঃ ২৯
ব্যাখ্যা: মানুষ এমন কৃপণও হবে না যে, নিজের ও পরিবারবর্গের প্রয়োজনেও ব্যয় করবে না। আর এমন মুক্তহস্তও হবে না যে, নিজ শক্তি ও সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য না করে বেহিসাব ব্যয় করে অপব্যয় ও নিঃস্বতার শিকার হবে। কৃপণতার ফলে মানুষ তিরস্কৃত ও নিন্দিত গণ্য হবে এবং অপব্যয়ের ফলে অবসাদগ্রস্ত ও অনুতপ্ত হবে। -তাফসীর আহসানুল বায়ান (সংক্ষেপিত)
➧ অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও। -সূরা জুম’আঃ ১০
➧ আল্লাহর নবী (ﷺ) বলেন, অন্যান্য ফরজের সঙ্গে হালাল কামাই-এর ব্যবস্থা গ্রহণও একটি ফরজ। -যয়ীফ, বাইহাকী, সিলসিলাহ যয়ীফাহ
নোট: হাদীসের বর্ণনায় দুর্বলতা থাকলেও তা উক্ত কুরআনের আয়াতের সমার্থক। অতএব যে ব্যক্তির কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ধন সম্পদ নেই, উপার্জন করা, ব্যবসা-বানিজ্য ছাড়া তাঁর আর কোন গতি নেই। কপর্দকহীন ব্যক্তি অপরের মুখাপেক্ষী ও সমাজে অবাঞ্চিত হয়ে পড়ে, সমাজে তার কোন মর্যাদা থাকে না, এমনকি হতাশায় সে আত্মহত্যা করতে পারে, যা তার জীবনের চরম পরাজয়। অথচ আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে সে স্বাবলম্বী হয়ে মর্যাদার সাথে জীবন-যাপন করতে পারে। বর্তমান যুগে হালাল জীবিকা অর্জনের অসংখ্য উপায় রয়েছে। এপ্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন যে জীবিকার সন্ধানে সকালে পাখিরাও এদিক ওদিক যায়।
➧ কা’ব বিন উজরা (রাঃ) বর্ণনা করেন-“রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছ দিয়ে এক ব্যক্তি গেল। সাহাবারা তাকে জীবিকা অর্জনে খুবই তৎপর ও আকৃষ্ট দেখে রসূল (স.)-কে বললেন, ‘যদি এ ব্যক্তির এ দৌড়ঝাঁপ ও অনুরাগ আল্লাহর রাস্তায় হতো তবে কতই না উত্তম হতো।” এ শুনে নবী (সঃ) এরশাদ করলেনঃ যদি এ ব্যক্তি নিজের ছোট ছোট সন্তানদের জন্য দৌড়ঝাঁপ করে তবে এ কাজ আল্লাহর রাস্তায় বলে গণ্য হবে। যদি সে বৃদ্ধ মাতা-পিতার পালনের জন্য সচেষ্ট থাকে, তাবে তাও আল্লাহর পথে বলে গন্য হবে। আর যদি সে নিজের জন্য এ চেষ্টা করে এবং তাতে তার উদ্দেশ্য থাকে কারুর কাছে হাত প্রসারিত না করা, তবে তার এ চেষ্টা তৎপরতাও আল্লাহর পথে বলে গণ্য হবে। অবশ্য যদি তার এ পরিশ্রম অধিক ধন-সম্পদ অর্জন করে মানুষের উপর নিজের বড়াই করা ও বড়াই দেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, তবে এ সমস্ত পরিশ্রম শয়তানের রাস্তায় বলে গন্য হবে।” -সহীহ্ আত তারগীব, হা/১৬৯২, সহীহুল জা’মে ২৪২৮, সিলসিলাহ সহীহাহ হা/২২৩২, বায়হাকী হা ৯৮৯২
ব্যাখ্যা: মুমিনের সারাটা জীবনই হচ্ছে এবাদত; তার প্রত্যেকটি কাজ সওয়াব ও পুরস্কারের যোগ্য। ইসলামে ‘জেহাদ’ ‘তাকওয়া’ এবং ‘এবাদতের’ যে ব্যাপক ধারণা তা এই হাদীসটিতে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। অন্য একটি হাদীসে এরশাদ করা হয়েছে” মু’মীন ব্যক্তি নিজের জন্যে নিজ স্ত্রীর জন্যে, নিজ সন্তান-সন্তুতির জন্যে ও নিজ কর্মচারীদের জন্যে যা কিছু খরচ করে সে সব সাদকা ও এবাদত বলে গণ্য হবে এবং তার জন্য আল্লাহতা’য়ালা মুমিনকে পুরস্কার দান করবেন ।’ -ইবনে মাযাহ, হা / ২১৩৮, সহীহ, তারগীব ও তারহীব।
➧ সুফিয়ান সওরী বলেছেন-“এখন থেকে পূর্বে নবুয়তের যামানায় ও খেলাফতের যামানায় মালকে অপছন্দনীয় জিনিস বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু আমাদের সময় মাল মুমিনের ঢাল স্বরূপ। তিনি বলেন, যদি আমাদের কাছে আজ এ ‘দিরহাম’ ও ‘দীনার’ না থাকতো তাহলে বাদশাহ ও আমীর (ধনী) লোকেরা আমাদেরকে ‘রুমাল’ বানিয়ে নিতো।”আজ যার কাছে কিছু ‘দিরহাম’ ও ‘দীনার’ আছে তা কিছু কাজে লাগানো দরকার (যাতে মুনাফা হয় ও মাল বৃদ্ধি পায়), কারণ এখন যামানাটা এমন যে মানুষ যদি অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়ে তবে সে প্রথমে নিজের ‘দ্বীন’ কে বিক্রি করে দেবে। হালাল উর্পাজন ব্যয় করার নাম অপব্যয় নয়।” -(মেশকাত, হা/৫০৬১, শরহে সুন্নাহ, পথের সম্বল, হা /৮৮)
ব্যাখ্যা: ‘বাদশাহ ও আমীর লোকেরা আমাদেরকে রুমাল বানিয়ে নিতো’-এ কথার তাৎপর্য হচ্ছেঃ যদি আমাদের কাছে অর্থ-সম্পদ না থাকতো তবে বাদশাহ ও ধনবান লোকদের কাছে যেতে বাধ্য হতাম ও তারা তাদের বাতিল উদ্দেশ্যে (অন্যায় কাজে) আমাদের ব্যবহার করতো। কিন্তু আমাদের কাছে অর্থ থাকায় আমরা তাদের মুখাপেক্ষী নই। রসূলুল্লাহ্র (ﷺ) যামানায় ও সাহাবাদের যামানায় মানুষের ঈমান খুব মজবুত ছিল, সেজন্য অভাব অনটনের মধ্যেও তারা সমস্ত প্রকার ঈমানী বিপত্তি থেকে নিরাপদ ছিল। কিন্তু আজকাল লোকের ঈমান সাধারণত: দূর্বল, দারিদ্র ও পরমুখপেক্ষিতায় মানুষ নিজের ঈমানকে বেঁচে দিতে প্রস্তুত হবে। তাই, সুফিয়ান সওরী (রাঃ) এই নসীহত করেছেন। এর দ্বারা তিনি আয়েশ সন্ধানী হবার শিক্ষা দান করেন নি।
নোট: উল্লেখ্য যে, একই কারনে দারিদ্র ও পরমুখাপেক্ষীতা ছাড়াও আরও বেশি পাওয়ার/খাওয়ার এবং খ্যাতি ও ক্ষমতার লালসার কারনে ধনী ও উচ্চ পদ-পদবিধারী ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও অন্যায় কাজে বড় ক্ষমতাবান ধনীর হাতে রুমালের মত ব্যবহৃত হতে পারে।
৩. চোগলখুরী করা:
➧ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। -সূরা কা’ফঃ ১৮
➧ নবী করীম (ﷺ) বলেন, বান্দা যখন ভালমন্দ বিচার না করেই কোন কথা বলে, তখন তার কারণে সে নিজেকে জাহান্নামের এত দূর গভীরে নিয়ে যায় যা পূর্ব প্রান্ত ও পশ্চিম প্রান্তের দূরত্বের সমান। -বুখারী ও মুসলিম
➧ ইবনে মাসউদ রাঃ হতে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, মিথ্যা অপবাদ কি জিনিস, আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব না? তা হচ্ছে চুগলী করা। লোকালয়ে কারো সমলোচনা করা। -মুসলিম ৬৮০২, হাদীস সম্ভার ২৯৮৯
➧ আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেছেন, পৃথিবীতে যে ব্যক্তি দ্বি-মুখী নীতি অবলম্বন করেছে কিয়ামতের দিন জাহান্নামে তার আগুনের দুটি মুখ থাকবে। -আবু দাউদ ৩/৪০৭৮
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। -বুখারী ও মুসলিম
➧ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, একদা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, এ দু’ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। কোন বড় গুনাহের কারণে তাদের শাস্তি হচ্ছে না। তবে হাঁ, বিষয়টা বড়ই। তাদের একজন কুটনামী করে বেড়াত। আর অন্যজন তার পেশাব থেকে আত্নরক্ষা করত না। -বুখারী ও মুসলিম
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তিকে আল্লাহ দু’চোয়ালের মধ্যবর্তীস্থানের (মুখের) মন্দ ও দু’পায়ের মধ্যবর্তী স্থানের (যৌনাঙ্গের) মন্দ থেকে রক্ষা করেছেন, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। -তিরমিযী
➧ নবী (ﷺ) বলেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা খারাপ, যে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে, সে একবার ঐ দলের নিকট এক রূপ নিয়ে আত্নপ্রকাশ করে এবং আরেক বার অন্য এক রূপে অন্য দলের নিকট আত্নপ্রকাশ করে। -বুখারী ও মুসলিম
চোগলখুরীর সংজ্ঞা: গণ্ডগোল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজনের কথা আরেকজনের নিকট লাগানো।
৪. গীবত করা:
➧ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। -সূরা কা’ফঃ ১৮
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমাকে যখন মি’রাজ করানো হলো তখন আমি এমন কতিপয় ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম যাদের নখ ছিলো লাল তামার। আর তারা তা দিয়ে তাদের চেহারা ও বুকের গোশত টেনে টেনে ক্ষত বিক্ষত করছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! এরা কারা? তিনি উত্তর দিলেন, তারা ঐ ব্যক্তি, যারা মানুষের নিন্দা করতো এবং তাদের অপমান করতো। (আহমাদ ৩/২২৪, আবু দাউদ ৪০৮২, সহীহ আরগীব আত-তারহীব ২৮৩৯)
গীবতের প্রতিকারে আসমানি হিদায়াত:
➧ যে ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে (তার গীবত করা ও ইজ্জত লুটার সময় প্রতিবাদ করে) সম্ভ্রম রক্ষা করে, সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট এই অধিকার পায় যে, তিনি তাকে দোযখ থেকে মুক্ত করে দেন। -মুসনাদে আহমাদ হা/২৭৬০৯, সহীহুল জামে’ হা/৬২৪০, হাদীস সম্ভার হা/২৯৭৭
➧ কোন বান্দা যদি অপর কোন লোকের ক্রুটি-বিচ্যুতি আড়াল করে রাখে, আল্লাহ্ তার ক্রুটি-বিচ্যুতি কিয়ামত দিবসে আড়াল করে রাখবেন। -মুসলিম, ইফা-৬৩৫৯
➧ নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে’। -বুখারী ও মুসলিম
নোট: ঈমাম নববী রহঃ বলেন, ‘জেনে রেখো, প্রত্যেক সুস্থ বিবেক সম্পন্ন বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তির অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা থেকে নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখা কর্তব্য। তবে যে কথা বললে উপকার ও কল্যান হয় তা বলা কর্তব্য। যখন কথা বলা ও চুপ থাকা উভয়ই উপকার ও কল্যানের দিক থেকে সমান থাকে তখন সুন্নত তরীকা হল চুপ থাকা। কেননা কোন কোন ক্ষেত্রে অনুমোদিত (মুবাহ) কথাবার্তাও হারাম ও অপছন্দনীয় কিছু ঘটার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণত এটাই ঘটে থাকে। নির্দোষ ও নিখুঁত অবস্থার সমকক্ষ আর কিছুই নাই’।
➧ নবী করীম (ﷺ) বলেন, বান্দা যখন ভালমন্দ বিচার না করেই কোন কথা বলে, তখন তার কারণে সে নিজেকে জাহান্নামের এত দূর গভীরে নিয়ে যায় যা পূর্ব প্রান্ত ও পশ্চিম প্রান্তের দূরত্বের সমান। -বুখারী ও মুসলিম
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, যদি তুমি তোমার কোন ভাইয়ের এমন কোন দোষের কথা বল যা তার মধ্যে আছে, তবে তুমি তার গীবত করলে। আর তুমি যদি তার সম্পর্কে এমন কথা বল যা তার মধ্যে নেই তাহলে তুমি তার প্রতি অপবাদ দিলে। -মিশকাত ৪৮২৯, সহীহ
➧ হযরত আবু উমামাহ বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কেয়ামতের দিন মানুষের কাছে তার উন্মুক্ত ‘আমল-নামা’ নিয়ে আসা হবে। (সে তা পড়বে) আর বলবে, ‘হে আমার প্রভু, আমি দুনিয়াতে অমুক অমুক নেক কাজ করেছিলাম, কিন্তু তা এতে লেখা নেই।’তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন– ‘মানুষের গীবত করার কারণে তোমার আমল-নামা থেকে ঐ নেকী মুছে দেয়া হয়েছে’। -তারগীব ও তারহীব
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তিকে আল্লাহ দু’চোয়ালের মধ্যবর্তীস্থানের (মুখের) মন্দ ও দু’পায়ের মধ্যবর্তী স্থানের (যৌনাঙ্গের) মন্দ থেকে রক্ষা করেছেন, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। -তিরমিযী
➧ মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ পছন্দ করেন না; তবে যার উপর যুলুম করা হয়েছে। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সূরা নিসা(ﷺ) ১৪৮
ব্যাখ্যা: “এ আয়াতে দুনিয়া হতে জোর-যুলুমের অবসান ঘটানোর এক অপূর্ব বিধান পেশ করা হয়েছে। যার মধ্যে একদিকে ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমনের জন্য মযলুমকে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে তাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আবার যুলুম ও বাড়াবাড়ি করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যদি তোমরা প্রতিশোধ নিতে চাও, তবে তোমাদের উপর যে পরিমাণ যুলুম করা হয়েছে, তোমরা ঠিক ততটুকুই প্রতিশোধ নিতে পার”। [সূরা আন-নাহল: ১২৬]
সাথে সাথে এ কথাও বলে দেয়া হয়েছে যে, প্রতিশোধ গ্রহণ করার ক্ষমতা ও অধিকার থাকা সত্বেও যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ক্ষমা করে দাও, তবে নিঃসন্দেহে তা তোমাদের জন্য অতি উত্তম। মোটকথাঃ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, মযলুম ব্যক্তি যদি অত্যাচারীর অন্যায়-অত্যাচারের কাহিনী লোকদের কাছে প্রকাশ করে বা আদালতে অভিযোগ করে, তবে তা হারাম গীবতের আওতায় পড়বে না। কারণ যালিম নিজেই মযলুমকে অভিযোগ উত্থাপন করতে সুযোগ করে দিয়েছে, বরং বাধ্য করেছে”। -সুত্রঃ তাফসীর আবু বকর জাকারিয়া
“কারো মধ্যে যদি কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তাহলে তার প্রকাশ্যে সমালোচনা না করার প্রতি শরীয়তে খুবই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, বরং তাকে নির্জনে বুঝাতে বলা হয়েছে। কিন্তু যদি ধর্মীয় কোন কল্যাণ থাকে, তাহলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করায় কোন অসুবিধা নেই। এমনিভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ্যে কোন কুকর্ম করা নিতান্ত অপছন্দনীয়। একে তো কুকর্মে লিপ্ত হওয়াটাই নিষিদ্ধ, যদিও তা পর্দার অন্তরালে হয়, তার উপর সেটা জনসমক্ষে প্রকাশ্যে করা অতিরিক্ত আর একটি অপরাধ। আর তার জন্য ঐ কুকর্মের অপরাধ দ্বিগুণ হতে পারে। উক্ত দুই ধরনের অপরাধের কথা এই আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। আর তাতে এটাও বলা হয়েছে যে, কারো কৃত বা অকৃত অপরাধের কারণে তাকে প্রকাশ্যে ভৎর্সনা করো না। অবশ্য যালেমের যুলুমের কথা জনসমক্ষে বর্ণনা করার ব্যাপারটা ব্যতিক্রম। যালেমের যুলুমের কথা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করার মাঝে কয়েকটি মঙ্গল নিহিত আছে। যেমন, সম্ভবতঃ সে যুলুম করা থেকে বিরত হতে পারে অথবা সে আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করবে। দ্বিতীয়তঃ লোকে তার ব্যাপারে সাবধান ও সতর্ক থাকবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন লোক রসূল (ﷺ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলল, 'আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দেয়। ' রসূল (ﷺ) তাকে বললেন, "তুমি তোমার ঘরের জিনিসপত্র বের করে রাস্তার উপর রেখে দাও।” লোকটি তাই করল। তারপর যেই রাস্তা দিয়ে পার হয়ে যায়, সেই তার কারণ জিজ্ঞাসা করে। আর সে প্রতিবেশীর অত্যাচারের কথা বলতেই প্রত্যেকেই তাকে অভিশাপ করে। প্রতিবেশী এই পরিস্থিতি দেখে নিজের ভুল স্বীকার করল এবং 'ভবিষ্যতে আর কোনদিন কষ্ট দেবে না' বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। আর প্রতিবেশীকে নিজ জিনিসপত্রগুলিকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করল”। (আবু দাউদ, আদব অধ্যায়) – সুত্রঃ তাফসীর আহসানুল বায়ান
নোট: শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে ছয়টি কারণে গীবত করাতে কোন দোষ নেই। যেগুলির বিবরণ ইমাম মুহিউদ্দীন ইয়াহইয়া আন-নববী রহঃ তাঁর রিয়াদুস সালেহীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আগ্রহী পাঠক উক্ত কিতাব বা তার বঙ্গানুবাদ থেকে জেনে নিতে পারেন।
৫. ডাকাতি ও রাহাজানি করা: ডাকাতি ও রাহাজানি করা অর্থাৎ অবৈধভাবে বল প্রয়োগ করে বা বল প্রয়োগের হুমকি দিয়ে কোন স্থান বা ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া।
➧ যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে (অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়) তাদের শাস্তি এই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। ইহকালে এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। -সূরা মায়িদাহ ৩৩
ব্যাখ্যা: উক্ত আয়াত অবতীর্ণের কারণ এই যে, উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক মুসলমান হয়ে মদীনায় আগমন করে এবং মদীনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের প্রতিকূল হয়। অতঃপর নবী (ﷺ) তাদেরকে মদীনার বাহিরে যেখানে সাদাকাহর উট ছিল সেখানে পাঠিয়ে দেন, সেখানে তারা উটের প্রস্রাব ও দুধ পান করবে, তাতে আল্লাহ আরোগ্যদান করবেন। সুতরাং কিছু দিনের মধ্যেই তাদের অসুখ ভালো হয়ে গেল। কিন্তু তারপর তারা উটের রাখালকে মেরে ফেললো এবং উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে চলে গেল। যখন রসূল (ﷺ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছল, তখন তিনি সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-কে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে তাদেরকে উট সহ ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। (অতঃপর তাদেরকে পাকড়াও করে রসূল (ﷺ)-এর সামনে পেশ করা হল।) নবী (ﷺ) তাদের হাত-পা কেটে ফেলা এবং চোখে গরম শলাকা ফিরানোর নির্দেশ দিলেন। (কেননা তারাও রাখালদের সাথে অনুরূপ আচরণ করেছিল।) অতঃপর তাদেরকে রৌদ্রে রাখা হল, ফলে তারা ধড়ফড় করে মৃত্যুবরণ করল। সহীহ বুখারীতে এই শব্দ সহ বর্ণিত হয়েছে যে, তারা চুরিও করেছিল, হত্যাও করেছিল, ঈমান আনার পর কুফরীও করেছিল, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূল (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিল। (তাফসীর আবু বকর জাকারিয়া)
৬. চুরি করা: (না বলে পর দ্রব্য নেয়া)
➧ জাবের রাঃ কর্তৃক বর্ণিত, মেরাজের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, এমনকি (সূর্য-গ্রহণের নামাজ পড়ার সময়) জাহান্নামে আমি এক মাথা বাঁকানো লাঠিওয়ালাকে দেখলাম, সে তার নাড়িভুঁড়ি টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে, যে তার ঐ লাঠি দিয়ে হাজীদের সামান চুরি করত। লাঠির ঐ বাঁক দিয়ে সামান টেনে নিত। অতঃপর কেউ তা টের পেলে বলত, আমার লাঠিতে আপনা-আপনিই ফেঁসে গেছে, আর কেউ টের না পেলে সামানাটি নিয়ে চলে যেত। -মুসলিম ২১৪০
➧ আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃত কর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৩৮)
ব্যাখ্যা: সমগ্র বিশ্বের প্রকৃত বাদশাহ যিনি, যিনি প্রজ্ঞাময় ও পরাক্রমশালী। তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়নে চুরির দরজা বন্ধ হয়ে দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাফসীর ইবনে কাছির (সংক্ষেপিত) ।
➧ নবী (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে অসীলা বানিয়ে (তার কোন ক্ষতি সাধন করে অথবা তাকে কষ্ট দিয়ে) এক গ্রাসও কিছু ভক্ষন করবে, আল্লাহ তাকে অনুরূপ গ্রাস জাহান্নাম থেকে ভক্ষন করাবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে অসীলা বানিয়ে (তার কোন ক্ষতি সাধন করে অথবা তাকে কষ্ট দিয়ে) একটি কাপড় পরিধান করবে, আল্লাহ তাকে অনুরূপ কাপড় জাহান্নাম থেকে পরিধান করাবেন। -আহমাদ ১৮০১১, আবু দাউদ ৪৮৮৩, হাকেম ৭১৬৬, সহীহুল জামে’ ৬০৮৩
➧ বনু মাখযুম গোত্রের এক মহিলা বিভিন্ন বস্তু ধার নিয়ে পরে অস্বীকার করতো। নবী (ﷺ) তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। -বুখারী ৩৪৭৫, মুসলিম ৪৫০৫
➧ নবী (ﷺ) যুদ্ধের ঢাল চুরি করা চোরের হাত কেটেছেন, যার মূল্য ছিল তিন দিরহাম। (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত)
চুরি করা বস্তুর ব্যাপারে অধিকাংশ আলেমগনের অভিমতঃ চুরি করা বস্তু মালিকের কাছে ফেরত দেয়া ব্যতীত চোরের তাওবায় কোন লাভ হবে না। কিন্তু সে গরীব হলে মালিকের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারে।