১. কুরআন অনুযায়ী আমল না করা:
➧ নিশ্চয় যারা আমাদের আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে অবশ্যই তাদেরকে আমরা আগুনে পোড়াব; যখনই তাদের চামড়া পুড়ে দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া বদলে দেব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। -সূরা নিসা(ﷺ) ৫৬
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আর ঐ লোকটি যার নিকটে আপনি এসেছিলেন, যার মাথা প্রস্তারাঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ করা হচ্ছে। সে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করেছিল এবং তা তেলাওয়াত করা পরিত্যাগ করেছিল। আর ফরয সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকত। -বুখারী ১১৪৩, ৭০৪৭, সহীহ ইবনে খুযাইমাহ ৯৪২, সুত্র: -কবরের আযাব, ড. কাবীরুল ইসলাম
ব্যাখ্যা: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ বলেন, এটাও সম্ভাবনা রয়েছে যে, কুরআন তেলাওয়াত পরিত্যাগ করা ও তার উপর আমল না করার কারণে শাস্তি দেওয়া হবে। -ফাতহুল বারী ৩/২৫১ পৃঃ (সংক্ষেপিত)
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেন, মুনাফিক ও কাফির ব্যক্তিকেও বলা হবে, তুমি এ ব্যক্তি (রসূল (ﷺ) সম্পর্কে কি বলতে? সে উত্তরে বলবে, আমি জানি না। লোকেরা যা বলতো, আমি তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, তুমি না নিজে জেনেছ, না তেলাওয়াত করে শিখেছ। আর তাকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা অতি জোরে আঘাত করা হবে, যার ফলে সে এমন বিকট চিৎকার করে উঠবে যে, দু’জাতি (মানুষ ও জিন) ব্যতীত তার আশেপাশের সকলেই তা শুনতে পাবে।
অপর বর্ণনায় ঐ ব্যক্তিকে তখন বলা হয়, তুমি জানার চেষ্টা করনি কেনো? আল্লাহর কিতাব পড়নি কেনো? অতঃপর তাকে লোহার হাতুড়ী দ্বারা এমনভাবে পিটাতে শুরু করে যে, পিটানোর চোটে সে বিকট চিৎকার করতে থাকে। মানুষ ও জিন ব্যতীত সব কিছুই তার চিৎকার শুনতে পায়। -বুখারী ১৩৭৪, মুসলিম, আবু দাউদ ৪৭৫১, মিশকাত ১২৬, সুত্র: -কবরের আযাব, ড. কাবীরুল ইসলাম
➧ “আর যে আমার স্মরণ (কুরআন) থেকে বিমুখ থাকবে, নিশ্চয় তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত (দুনিয়া, কবর ও আখিরাতে) এবং আমরা তাকে কিয়ামতের দিন জমায়েত করব অন্ধ অবস্থায়।” (সূরা ত্ব-হা, ১২৪)
কুরআন অনুযায়ী আমল না করার প্রতিকারে আসমানী হেদায়াত:
➧ আমরা বললাম, ‘তোমরা সকলে এখান থেকে নেমে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট কোন হিদায়াত আসবে তখন যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না’। -সূরা বাকারাহঃ ৩৮
➧ “এটা সেই কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ২)
➧ নিশ্চয় এ কুরআন এমন পথনির্দেশ করে, যা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং ৯)
➧ “অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে, এ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পারিচালিত করেন এবং তাদেরকে নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান। আর তাদেরকে সরল পথের দিশা দেন।” (সূরা মায়িদাহ, আয়াত নং ১৫-১৬)
➧ “আর এ কিতাব, যা আমরা নাযিল করেছি – বরকতময়। কাজেই তোমরা তার অনুসরণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।” (সূরা আন’আম, আয়াত নং ১৫৫)
➧ “বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ---আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' আর তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ কর (অর্থাৎ তাওবাহ কর যার অন্যতম শর্ত হল অবিলম্বে পাপাচার থেকে বিরত হওয়া এবং পুনরায় তাতে লিপ্ত না হবার দৃঢ় সংকল্প করা) তোমাদের কাছে শাস্তি আসার আগে; তার পরে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। আর তোমরা তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে উত্তম যা নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ কর, তোমাদের উপর অতর্কিতভাবে শাস্তি আসার আগে, অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না। যাতে কাউকেও বলতে না হয়, ‘হায় আফসোস! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি যে শৈথিল্য করেছি তার জন্য! আর আমি তো ঠাট্টাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। ' অথবা কেউ যেন না বলে, ‘হায়! আল্লাহ আমাকে হিদায়াত করলে আমি তো অবশ্যই মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।' অথবা শাস্তি দেখতে পেলে যেন কাউকেও বলতে না হয়, ‘হায়! যদি একবার আমি ফিরে যেতে পারতাম তবে আমি মুহসিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম!' হ্যাঁ, অবশ্যই আমার নিদর্শন তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি এগুলোতে মিথ্যারোপ করেছিলে এবং অহংকার করেছিলে; আর তুমি ছিলে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা যুমার, আয়াত নং ৫৩-৫৯)
নোট: উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমুহ থেকে পাঠক অনুধাবন করতে পারেন কুরআনের চর্চা ও অব্যাহত তেলাওয়াত মানব জীবনে শুভ পরিণাম লাভে কত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য যে তেলাওয়াত শব্দের আভিধানিক অর্থ পাঠ করা, অনুসরন করা। আর কুরআনের অনুসরণের জন্য এর অর্থ জানা জরুরী। নিজে কুরআন চর্চা ও আলেমদের আলোচনা শুনার মাধ্যমে যা সম্ভব। অথচ ক্ষণস্থায়ী জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ লাভের আশায় অধিকাংশ মানুষ কুরআনকে উপেক্ষা ও অবহেলা করে নিজেরা এবং তাদের সন্তানদেরকে অসংখ্য জাগতিক বিষয়ের গ্রন্থ অধ্যয়নে প্রভূত সময় শক্তি ও অর্থ ব্যয় করছেন, অথচ আমাদের প্রাণবায়ু পর্যন্ত যে মহাপরাক্রমশালী স্রষ্ঠার নিয়ন্ত্রণে তাঁর মহিমান্বিত গ্রন্থ আল কুরআন ও তার নীতি-বিধানকে পাশ কাটিয়ে সফলকাম হবার প্রচেষ্টা দুরাশার নামান্তর। তাই জীবন ঘনিষ্ট শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে পেশাগত জ্ঞান-দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি আল কুরআনের পঠন-পাঠন ও অনুসরণের লক্ষ্যে শিক্ষার সর্বস্তরে তা পাঠ্যসূচীভূক্ত করা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহ যাদেরকে সমাজে মর্যাদা দান করেছেন প্রত্যেক জাতির সেই জ্ঞানীজন ও নেতৃবৃন্দকে এব্যাপারে কার্যকরী ভূমিকা পালন করা উচিত। নইলে মহান আল্লাহর পরীক্ষায় তারা ফেল করবেন।
➧ আমি কসম করছি তার, যা তোমরা দেখতে পাও। এবং যা তোমরা দেখতে পাও না। নিশ্চয়ই এই কুরআন এক সম্মানিত রসূলের বার্তা। এটা কোন কবির কথা নয়; (আফসোস যে,) তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর। এটা গণকের কথাও নয়; (আফসোস যে,) তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাক। এটা বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। সে যদি আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত। তবে অবশ্যই আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম । এবং কেটে দিতাম তার জীবন-ধমনী। অতঃপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তাকে রক্ষা করতে পারত। এই কুরআন আল্লাহভীরুদের জন্য অবশ্যই এক উপদেশ। আমি অবশ্যই জানি যে, তোমাদের মধ্যে মিথ্যাজ্ঞানকারী রয়েছে। আর এই কুরআন নিশ্চয়ই অবিশ্বাসীদের জন্য আফসোসের কারণ হবে। অবশ্যই এটা নিশ্চিত সত্য । (সূরা হাক্কাহ, ৩৮-৫১ আয়াত)
ব্যাখ্যাঃ এ থেকে জানা গেল যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) সত্য রসূল ছিলেন। যেহেতু তাঁকে আল্লাহ শাস্তি দেননি। বরং বহু প্রমাণাদি, অলৌকিক ঘটনাবলী এবং বিশেষ সমর্থন ও সাহায্য দানে তাঁকে ধন্য করেছেন। তাফসীর আহসানুল বায়ান (সংক্ষেপিত) ।
➧ তুমি তো এর পূর্বে কোন গ্রন্থ পাঠ করতে না এবং তা নিজ হাতে লিখতেও না যে, মিথ্যাবাদীরা (তা দেখে) সন্দেহ পোষণ করবে। বরং যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তাদের অন্তরে এ (কুরআন) স্পষ্ট নিদর্শন। কেবল অনাচারীরাই আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করে। (সূরা আনকাবুত, ৪৮-৪৯)
➧ বল, ‘যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জীন সমবেত হয় ও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।’ (সূরা বনী ইসরাঈল ৮৮)
➧ নিশ্চয় আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই ওর সংরক্ষক। (সূরা হিজর ১৫)
নোটঃ সমগ্র পৃথিবীতে বালক বৃদ্ধ নির্বিশেষে কোটি কোটি হাফেজে কুরআনের মাধ্যমে মহান আল্লাহ যুগ যুগান্তর ধরে কুরআনকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষণ করে চলেছেন । কম্পিউটারের রেকর্ড মুছে যেতে পারে কিন্তু মানবের হৃদয় থেকে কুরআনকে মুছে ফেলা সম্ভব নয় । এটি কুরআনের অলৌকিকতার নিদর্শন ।
➧ নবী সাঃ বলেন, যে গৃহে কুরআন তেলাওয়াত করা হয় ওই গৃহ আসমানবাসীর জন্য এমনভাবে দৃশ্যমান হয় যেমন পৃথিবীবাসীর জন্য তারকারাজি দৃষ্টিগোচর হয় । - সিলসিলাহ সহীহাহ ৩১১২, আবু দাঊদ ১০৪৩, ইবনে মাজাহ ১৩৭৭, মিশকাত ৭১৪, মুয়াত্তা ১৬৮, আহমাদ ২/১৬, ফুযাইমা ১২০৫
➧ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, “মানুষকে কবরে দাফন করার পর তার নিকট আযাবের ফেরেশতা তার পায়ের দিক থেকে আসবে, তখন তার কুরআন তিলওয়াত ফেরেশতাদেরকে বাধা দিবে। ফেরেশতা যখন তার সামনের দিক থেকে আসবে, তখন তার দান খায়রাত ফেরেশতাদেরকে বাধা দিবে। আবার যখন ফেরেশতা তার পায়ের দিক থেকে আসবে, তখন তার পায়ে হেঁটে মসজিদে গমনাগমন ফেরেশতাদের প্রতিবন্ধক হবে।” (ত্বাবারানী, তারগীব ও তারহীব হা/৫২২৫, কবরের বর্ণনা হা/১৩৪, মুহঃ ইকবাল কীলানী)
২. নামাজ পরিত্যাগ করা:
➧ তোমাদেরকে কিসে সাকার-এ নিক্ষেপ করেছে? তারা বলবে, আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আর আমরা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করতাম না। এবং আমরা অনর্থক আলাপকারীদের সাথে বেহুদা আলাপে মগ্ন থাকতাম (সত্যকে খণ্ডন করে ভ্রষ্টতার সমর্থনে বিতর্ক করা) । আর আমরা প্রতিদান দিবসে মিথ্যারোপ করতাম। অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে। ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকার করবে না।” (সূরা মুদ্দাস্সির, আয়াত নং ৪২-৪৮)
➧ মুসলিম বান্দা এবং কাফের ও মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত পরিত্যাগ করা। (সহীহ মুসলিম, মেশকাত)
➧ আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেছেন, তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না – যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামাজ ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামাজ ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর) দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হলো প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি। -ইবনে মাজাহ ৩২৫৯, ৪০৩৪
➧ তাদের মাঝে এবং আমাদের মাঝে চুক্তি হচ্ছে সালাত, যে ব্যক্তি সালাত পরিত্যাগ করবে সে কাফের হয়ে যাবে। (বুখারী হা/৪৬, মুসলিম হা/৯৭, তিরমিযি, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
➧ তোমরা কোন কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করবে না। ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগ করবে না। কেননা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগ করবে সে মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। (হায়ছামী মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৪/২১৬, মুসতাদরাক হাকীম ৪/৪৪)
নোট: ১. সৌদী আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের সভাপতি মরহুম শাইখ সালেহ আল-উসাইমীন (রহঃ) তাঁর ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম গ্রন্থের সালাত অধ্যায়ে মোটেও সালাত আদায় করেনা এরূপ ব্যক্তিকে কাফের এবং ইসলাম থেকে বঞ্চিত বলে ফাতওয়া দিয়েছেন। খালেছভাবে তওবা না করলে তাকে কাফের ও মুরতাদ অবস্থায় হত্যা করতে হবে। গোসল না দিয়ে কাফন না পরিয়ে জানাযা না পড়িয়ে দাফন করতে হবে। মুসলমানদের গোরস্থানে দাফন করা যাবেনা। তার কাফের হওয়ার ব্যাপারে উপরোক্ত হাদীস ছাড়াও কুরআন সুন্নাহর অনেক দলীল তিনি উল্লেখ করেছেন।
২. হাদীস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সালাতুর রসূল (ﷺ) কিতাবের লেখক / সংকলক ডঃ মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিবের ফাতওয়া / মতামতঃ সালাত তরক করাকে হাদীসে কুফরী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামও একে কুফরী হিসাবে গণ্য করতেন। তারা নিঃসন্দেহে জাহান্নামী। তবে এই ব্যক্তিগণ যদি খালেছ অন্তরে তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতে বিশ্বাসী হয় এবং ইসলামের হালাল-হারাম ও ফরজ-ওয়াজীবসমূহের অস্বীকারকারী না হয় এবং শিরক না করে, তাহলে তারা কালেমায়ে শাহাদাতকে অস্বীকারকারী কাফিরগণের ন্যায় ইসলাম থেকে খারিজ নয় বা চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়। কেননা এই প্রকারের মুসলমানেরা কর্মগতভাবে কাফির হলেও বিশ্বাসগতভাবে কাফির নয়। বরং খালিছ অন্তরে পাঠ করা কালেমার বরকতে এবং কবীরা গোনাহগারদের জন্য শেষনবী মুহাম্মাদ (ﷺ) –এর শাফায়াতের ফলে শেষপর্যন্ত একসময় তারা জান্নাতে ফিরে আসবে। তবে তারা সেখানে জাহান্নামী বলেই অভিহিত হবে। সেটা হবে বড়ই লজ্জাকর বিষয়।
বে-নামাযীর প্রতিকারে আসমানী হেদায়াত:
➧ আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “প্রত্যেক সালাতের সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা নিয়োগ করা হয়। তিনি আহ্বান করেনঃ হে আদম সন্তান! ওঠো এবং নির্বাপিত কর সে আগুন যা তোমরা পাপের মাধ্যমে প্রজ্জলিত করেছো।” -ত্ববারানী, মাযমাউওল যাওয়ায়েদ ১/২৯৯, তারগীব ও তারহীব ৩৫৮
➧ আমর ইবনে মুররা আল জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করীম (ﷺ) এর কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি মনে করেন, যদি আমি এ সাক্ষ্য দেই যে আল্লাহ্ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রসূল, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি, যাকাত প্রদান করি, রমজানের সিয়াম পালন করি এবং ক্বিয়ামুল্লাইল করি-তাহলে আমি কাদের অন্তর্ভুক্ত হব? তিনি বললেন, “সিদ্দিক এবং শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” -বাযযার ৪৫, ইবিনে হিব্বান ৩৪২৯, ইবনে খুযায়মা ২/২২, তাগরীব ও তারহীব ৩৬১
➧ উবাদা বিন সামেত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বান্দাদের উপর লিখে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি এই সালাতগুলোকে যথাযথভাবে আদায় করবে, তার অধিকারকে হালকা ভেবে কোন সালাত বিনষ্ট করবে না, তার জন্য আল্লাহর কাছে রয়েছে অঙ্গীকার। তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি এই সালাতগুলো আদায় করবে না তার জন্য আল্লাহর কাছে কোন অঙ্গীকার নাই। আল্লাহ্ চাইলে তাকে শাস্তি দিবেন অথবা চাইলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” -মালেক হা/ ১/১২৩, আবু দাঊদ হা/১৮২০, নাসাঈ হা/৪৪৭, ইবনে হিব্বান হা/১৭২৯, তারগীব ও তারহীব, হা/৩৭০ সহীহ
➧ সালমা ইবনে আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, “তোমরা জেনে রাখো, নিশ্চয়ই তোমাদের আমলগুলোর মধ্যে থেকে সর্বাধিক ফযীলতপূর্ণ (মর্যাদাপূর্ণ) আমল হচ্ছে সালাত।” -ত্ববারানী হা/ ৭/১১৬, তারগীব ও তারহীব, হা/৩৮০ সহীহ
➧ ইবনু মাসউদ (রা.) নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, আল্লাহর একজন বান্দার কবরে ১০০ বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অতঃপর সে বিরামহীন দু'আ এবং প্রার্থনা করতে থাকে ফলশ্রুতিতে ১০০ বেত্রাঘাতকে একটি করে দেয়া হয়। অতঃপর তাকে একটি বেত্রাঘাত করা হয় যার কারণে তার কবর আগুনে ভরে যায় ৷ অতঃপর যখন তার থেকে আগুন (এর আযাব) উঠিয়ে নেয়া হয় এবং সে সংজ্ঞা ফিরে পায় সে বলল, তোমরা আমাকে কি কারণে বেত্রাঘাত করেছ? (ফেরেশতারা) তারা উত্তর দিল, তুমি অযূ ছাড়া এক ওয়াক্ত সলাত আদায় করেছিলে এবং অত্যাচারিত ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলে কিন্তু তাকে (কোন) সাহায্য করনি । (সহীহাহ্ হা.২৭৭৪) তহাভী তাঁর শরহু মুশকিল আসারের (৪/২৩১)-তে ‘ইবনু মাসউদ (রা) -এর সূত্রে মারফূআন বর্ণিত হয়েছে।
হাদীসটি সহীহ।
➧ আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আছরের সালাত ছেড়ে দিল, তার সমস্ত আমল ধ্বংস হয়ে গেল।” –আহমাদ হা/ ৬/৪৪১, তারগীব ও তারহীব, হা/৪৭৯ সহীহ
➧ আর আপনি সালাত কায়েম করুন দিনের দু প্রান্তভাগে ও রাতের প্রথমাংশে। নিশ্চয় সৎকাজ অসৎ কাজকে মিটিয়ে দেয়। উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য এটা এক উপদেশ। (সূরা হুদ ১১৪ নং আয়াত)
➧ আবূ হুরায়রা (রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মৃতব্যক্তি তাকে দাফন করে ফিরে আসা লোকদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। সে মুমিন হলে সালাত তার মাথার পার্শ্বে দাঁড়ায়, সিয়াম তার ডান দিকে, যাকাত তার বাম দিকে, দান-সাদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ভাল কাজের আদেশ, মানুষের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য প্রভৃতি উত্তম কার্যাবলী তার পায়ের কাছে দাঁড়ায়। তার মাথার নিকট দিয়ে ফেরেশতা আসতে চাইলে সালাত বলে, আমার এ দিক দিয়ে এখানে প্রবেশের পথ নেই। ডান দিক দিয়ে ফেরেশতা আসতে চাইলে সিয়াম বলে, আমার দিক দিয়ে এখানে প্রবেশের পথ নেই। বাম দিক দিয়ে ফেরেশতা আসতে চাইলে যাকাত বলে, আমার দিক দিয়ে এখানে প্রবেশের পথ নেই। পায়ের দিক দিয়ে ফেরেশতা আসতে চাইলে দান-সাদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ভাল কাজের আদেশ, মানুষের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য প্রভৃতি উত্তম কার্যাবলী বলে, আমার দিক দিয়ে এখানে প্রবেশের রাস্তা নেই।”
রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “তখন তাকে বলা হবে, বস। সে উঠে বসবে। এসময় তার মনে হবে সূর্য যেন অস্তমিত হতে যাচ্ছে। তখন তাকে বলা হবে, আমরা তোমাকে যা জিজ্ঞেস করি, সে সম্পর্কে আমাদেরকে খবর দাও। সে বলবে, আমাকে ছেড়ে দাও, যাতে আমি সালাত আদায় করতে পারি। তাকে বলা হবে, তুমি অতি সত্বর তা করতে পারবে, তুমি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দাও। (এ কথার মাধ্যমে সে নামাজী ছিল কিনা তার মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হয়ে গেল এবং সে সফলকাম হল) সে বলবে, তোমরা আমাকে কি জিজ্ঞেস করবে? তখন তারা বলবে, তোমাদের মধ্যেকার এ ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কি বল এবং তার ব্যাপারে তুমি কি সাক্ষ্য দাও?” রাবী বলেন, “সে বলবে, মুহাম্মদ সম্পর্কে? তাকে বলা হবে, হ্যাঁ। সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহ্র রসূল (বাণীবাহক/সংবাদবাহক) এবং তিনি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন। তখন আমরা তাকে সত্য বলে স্বীকার করেছিলাম। অতঃপর তাকে বলা হবে, এর উপরই তুমি জীবিত ছিলে, এর উপরই তুমি মৃত্যুবরণ করেছ এবং এর উপরই তুমি পুনরুত্থিত হবে ইনশাআল্লাহ্। অতঃপর তার কবরকে সত্তর হাত প্রশস্ত করা হবে, তার জন্য তা আলোকিত করা হবে। তারপর জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। তখন তাকে বলা হবে, দেখ, সেখানে আল্লাহ্ তোমার জন্য কি প্রস্তুত করে রেখেছেন। এতে তার আনন্দ-উল্লাস বৃদ্ধি পাবে।”
“অতঃপর জাহান্নামের দিকে তার জন্য একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। তখন তাকে বলা হবে, এটা তোমার স্থান এবং এর মধ্যে তোমার জন্য তাই আছে যা আল্লাহ্ তোমার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন, যদি তুমি আল্লাহ্র অবাধ্য হতে। তখন তার আনন্দ-উল্লাস আরও বেড়ে যাবে। অতঃপর সুন্দর একটি প্রাণীর মধ্যে তার আত্মা রাখা হবে, তা হচ্ছে সবুজ বর্ণের পাখী, জান্নাতের বৃক্ষের সাথে যা ঝুলে থাকবে। আর তার শরীর সেই মাটিতে পরিণত করা হবে যা দ্বারা তাকে তৈরি করা হয়েছিল।” রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “এটাই হচ্ছে আল্লাহ্র সেই কথা ‘আল্লাহ্ পার্থিব জীবনে ও আখেরাতে অবিচল রাখবেন সে সকল লোককে যারা ঈমান এনেছে প্রতিষ্ঠিত বাণীতে’(সূরা ইবরাহীম ১৪/২৭)-এর তাৎপর্য।” ওমর ইবনুল হাকাম ইবনে সাওবান বলেন, “তারপর তাকে বলা হবে, ঘুমাও। সে ঘুমিয়ে যাবে নতুন বরের ন্যায়। তাকে তার পরিবারের একান্ত আপনজন ব্যতীত কেউ জাগ্রত করতে পারবে না। অবশেষে আল্লাহ্ তাকে পুনরুত্থিত করবেন।”
রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “সে যদি কাফের হয়, তাহলে মাথার দিক দিয়ে আযাবের ফেরেশতা আসবে, সেখানে কাউকে পাবে না। তার ডান দিক দিয়ে আসবে, সেখানে কাউকে পাবে না। তার বাম দিক দিয়ে ও পায়ের দিক দিয়ে আসবে, সেখানেও কাউকে পাবে না। তাকে বলা হবে, বস। সে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বসবে। তখন তাকে বলা হবে, আমরা তোমাকে যা জিজ্ঞেস করি, তার উত্তর দিবে। সে বলবে, তোমরা আমাকে কি জিজ্ঞেস করবে? তাকে বলা হবে, তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি ছিল, তার সম্পর্কে তোমার মতামত কি? তাঁর সম্পর্কে তুমি কি বল এবং তাঁর ব্যাপারে তুমি কি সাক্ষ্য দাও?” রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “সে বলবে, কোন ব্যক্তি? তাকে বলা হবে, সে ব্যক্তি যে তোমাদের মাঝে ছিল। সে নাম নির্দেশ করতে পারবে না। তাকে বলা হবে, মুহাম্মদ। সে বলবে, আমি জানি না। তবে লোকদেরকে আমি তাঁর ব্যাপারে কথা বলতে শুনেছি। সুতরাং তারা যা বলত, আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, এর উপরই তুমি জীবিত ছিলে, এর উপরই তুমি মৃত্যুবরণ করেছ এবং এর উপরই তুমি পুনরুত্থিত হবে ইনশাআল্লাহ্। অতঃপর তার জন্য জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খোলা হবে। তাকে বলা হবে, এটা তোমার বাসস্থান এবং এর মধ্যে যা আছে, তা আল্লাহ্ তোমার জন্য তৈরি করেছেন। তখন তার আফসোস ও দুঃখ বেড়ে যাবে। অতঃপর জান্নাতের দিকে তার জন্য একটি দরজা খোলা হবে। তাকে বলা হবে, এটা তোমার স্থান ছিল। এতে তার আফসোস ও দুঃখ বৃদ্ধি পাবে। তারপর তার কবরকে সংকীর্ণ করা হবে, যাতে এক দিকের হাড্ডি অন্য দিকে চলে যাবে। এটা হচ্ছে সংকীর্ণ জীবন। যে সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন, ‘অবশ্যই তাঁর জীবন যাপন হবে সংকুচিত এবং আমরা তাকে ক্বিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়।’(সূরা ত্ব-হা ২০/১২৪)” (সুত্র: মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদিসটি সহীহ, তা’লীকুত তারগীব ৪/১৮৮-৮৯, হা/৩১০৮, সহীহ আত-তারগীব হা/৩৫৬১, কবরের আযাব, ড. কাবীরুল ইসলাম)
➧ তাদের পর এল অপদার্থ পরবর্তিগণ, তারা নামায নষ্ট করল ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হল; সুতরাং তারা অচিরেই অমঙ্গল প্রত্যক্ষ করবে । (সূরা মারইয়াম ৫৯)
ব্যাখ্যাঃ আল্লাহর পুরস্কারপ্রাপ্ত বান্দাদের বর্ণনার পর ঐ সমস্ত লোকেদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে যারা এর বিপরীত আল্লাহর আদেশের অন্যথাচরণ করে ও বিমুখতা অবলম্বন করে। নামায বিনষ্ট করার অর্থ একেবারে নামায না পড়া; যা মূলতঃ কুফরী, অথবা নামাযের সময় বিনষ্ট করা; যার অর্থ সঠিক সময়ে নামায আদায় না করা, যখন ইচ্ছা পড়া বা বিনা ওযরে দুই বা ততোধিক নামাযকে একত্রে পড়া, অথবা কখনো দুই, কখনো চার, কখনো এক, কখনো পাঁচ অক্তের নামায পড়া। এ সমস্ত নামায বিনষ্ট করার অর্থে শামিল। এ রকম ব্যক্তি অত্যন্ত পাপী এবং আয়াতে বর্ণিত শাস্তির যোগ্য। غَي এর অর্থ ধ্বংস, অমঙ্গল, অশুভ পরিণাম বা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম। (তাফসীর আহসানুল বায়ান)
মোটকথাঃ সালাত আদায় ত্যাগ করা অথবা সালাত থেকে গাফেল ও বেপরোয়া হয়ে যাওয়া প্ৰত্যেক উম্মতের পতন ও ধ্বংসের প্রথম পদক্ষেপ । সালাত আল্লাহর সাথে মুমিনের প্রথম ও প্রধানতম জীবন্ত ও কার্যকর সম্পর্ক জুড়ে রাখে। এ সম্পর্ক তাকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কেন্দ্র বিন্দু থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না। এ বাঁধন ছিন্ন হবার সাথে সাথেই মানুষ আল্লাহ থেকে দূরে বহুদূরে চলে যায়। এমনকি কার্যকর সম্পর্ক খতম হয়ে গিয়ে মানসিক সম্পর্কেরও অবসান ঘটে। তাই আল্লাহ একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে এখানে একথাটি বর্ণনা করেছেন যে, পূর্ববতী সকল উম্মতের বিকৃতি শুরু হয়েছে সালাত নষ্ট করার পর। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “বান্দা ও শির্কের মধ্যে সীমারেখা হলো সালাত ছেড়ে দেয়া’ [মুসলিম: ৮২] আরও বলেছেন: “আমাদের এবং কাফেরদের মধ্যে একমাত্র সালাতই হচ্ছে পার্থক্যকারী বিষয়, (তাদের কাছ থেকে এরই অঙ্গীকার নিতে হবে) সুতরাং যে কেউ সালাত পরিত্যাগ করল সে কুফরী করল। [তিরমিয়ী:২৬২১]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেনঃ ‘গাই’ জাহান্নামের এমন একটি গর্তের নাম যাতে সমগ্র জাহান্নামের চাইতে অধিক আযাবের সমাবেশ রয়েছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ ‘গাই' জাহান্নামের এমন একটি গুহা জাহান্নামও এর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে। [দেখুন, কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] (তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত)
৩. পিতা-মাতার অবাধ্যতা:
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে সর্বাপেক্ষা বড় গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করব না? কথাটা তিনি তিনবার বললেন। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! অবশ্যই বলে দিন। তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা। তিনি হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন, অতঃপর তিনি সোজা হয়ে বসে আবার বলেন, সাবধান, মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষী দেয়া। তিনি কথাগুলো বারবার বলতে লাগলেন। এমনকি আমরা (মনে মনে) বলতে লাগলাম, তিনি যদি চুপ হয়ে যেতেন। (বুখারী ও মুসলিম)
➧ দুটি (পাপ) দরজা এমন রয়েছে, যার শাস্তি দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করা হয়; বিদ্রোহ ও পিতা-মাতার অবাধ্যাচরন। (হাকেম ৭৩৫০, সহীহুল জামে’ ২৮১০)
➧ তিন ব্যক্তির নিকট হতে আল্লাহ ফরজ-নফল কিছুই গ্রহণ করবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে প্রচারকারী এবং তাকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি। (তাবারানী ৭৫৪৭, সহীহুল জামে’ ৩০৬৫)
➧ তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়েও দেখবেন না, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, পুরুষবেশিনী বা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিনী মহিলা এবং মেড়া পুরুষ (যে তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনের চরিত্রহীনতা ও নোংরামিতে চুপ থাকে এবং বাধা দেয় না) । (আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈর কুবরা ২৩৪৩, হাকেম ২৫৬২, সহিহুল জামে’ ৩০৭১)
➧ পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি, আর তাদের অসন্তুষ্টিতে রয়েছে তাঁর অসন্তুষ্টি। (তিরমিযী ১৮৯৯, হাকেম ৭২৪৯, বাযযার ২৩৯৪, তাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ৫১৬)
নোট: সঙ্গত কারণে পিতামাতা অসন্তুষ্ট থাকাবস্থায় কোন সন্তানের মৃত্যু হলে তা খারাপ মৃত্যুর লক্ষণ হতে পারে। এ মর্মে তিবরানী ও মুসনাদে আহমাদ শরীফে বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদীসের ঘটনায় জানা যায় যে, মৃত্যুর কিছু আগে তাঁর একজন সাহাবীর খারাপ মৃত্যু লক্ষণের কথা জানতে পেরে নবীজি (ﷺ) তাঁর ভাষায় তাকে জাহান্নাম থেকে কিভাবে রক্ষা করলেন তার বর্ণনা রয়েছে। (পিতামাতা ও সন্তানের অধিকার, ইউসুফ ইসলাহী)
➧ নবী (ﷺ) বলেছেন, পিতামাতার খিদমত ও আনুগত্যের কারণে আল্লাহ তায়ালা মানুষের হায়াত বাড়িয়ে দেন। -মুসনাদ ইবনে মুনী’, ইবনে ‘আদী, মা’রিফুল হাদীস ষষ্ট খণ্ড -৪১
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, তিন শ্রেণীর লোকের জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, আব্যাহতভাবে মদ পানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্যজন এবং এমন বেহায়া, যে তার পরিবারের অশ্লীলতাকে মেনে নেয়। -আহমাদ ৫৩৭২, ৬১১৩
পিতা-মাতার অবাধ্যতার প্রতিকারে আসমানী হিদায়াত:
➧ আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে 'উফ' বল না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল। আর মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর এবং বল, ‘হে আমার রব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন। -সূরা বনী ইসরাইল ২৩-২৪
ব্যাখ্যা: এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা পিতা-মাতার আদব, সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদতের সাথে একত্রিত করে ফরয করেছেন। যেমন, অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা নিজের শোকরের সাথে পিতা-মাতার শোকরকে একত্রিত করে অপরিহার্য করেছেন। বলা হয়েছেঃ “আমার শোকর কর এবং পিতা-মাতার ও” [সূরা লুকমানঃ ১৪]।
তাছাড়া বিভিন্ন হাদীসে পিতা-মাতার আনুগত্যও সেবা যত্ন করার অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, যেমনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “পিতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমাদের ইচ্ছা, এর হেফাযত কর অথবা একে বিনষ্ট করে দাও " [তিরমিয়ীঃ ১৯০১]। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ “আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসম্ভাষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত" [তিরমিয়ীঃ ১৮৯৯]। অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “সে ব্যক্তির নাক ধুলিমলিন হোক, তারপর ধুলিমলিন হোক, তারপর ধুলিমলিন হোক”, সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে কে? রসূল বললেনঃ “যে পিতা-মাতার একজন বা উভয়কে তাদের বৃদ্ধাবস্থায় পেল তারপর জান্নাতে যেতে পারল না”। [মুসলিম ২৫৫১]
অর্থাৎ যার পিতা-মাতা কাফের এবং তাকেও কাফের হওয়ার আদেশ করে এ ব্যাপারে তাদের আদেশ পালন করা জায়েয নয়, কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলতে হবে। বলাবাহুল্য, আয়াতে মারুফ' বলে তাদের সাথে আদর-আপ্যায়ন মূলক ব্যবহার বোঝানো হয়েছে। ইসলাম পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের এমনই গুরুত্ব দিয়েছে যে, যদি জিহাদ ফরযে আইন না হয়, ফরযে কেফায়ার স্তরে থাকে, তখন পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্যে জিহাদে যোগদান করা জায়েয নেই। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, “এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিহাদের যাওয়ার অনুমতি চাইল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তোমার পিতা মাতা কি জীবিত? সে বললঃ হ্যা। রসূল বললেন, “তাহলে তুমি তাদের খেদমতে জিহাদ করো”। [মুসলিম ২৫৪৯]
পিতা-মাতার সেবাযত্ন ও আনুগত্য পিতা-মাতা হওয়ার দিক দিয়ে কোন সময়ও বয়সের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। সর্বাবস্থায় এবং সব বয়সেই পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ওয়াজিব। কিন্তু বার্ধক্যে উপনীত হয়ে পিতা-মাতা সন্তানের সেবাযত্নের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং তাদের জীবন সন্তানদের দয়া ও কৃপার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন যদি সন্তানের পক্ষ থেকে সামান্যও বিমুখতা প্রকাশ পায়, তবে তাদের অন্তরে তা ক্ষত হয়ে দেখা দেয়। অপরদিকে বার্ধক্যের উপসর্গসমূহ স্বভাবগতভাবে মানুষকে খিটখিটে করে দেয়। তদুপরি বার্ধক্যের শেষপ্রান্তে যখন বুদ্ধি-বিবেচনা ও অকেজো হয়ে পড়ে, তখন পিতা-মাতার বাসনা এবং দাবীদাওয়া ও এমনি ধরনের হয়ে যায়, যা পূর্ণ করা সন্তানের পক্ষে কঠিন হয়। আল্লাহ তা'আলা এসব অবস্থায় পিতা-মাতার মনোতুষ্টি ও সুখ-শান্তি বিধানের আদেশ দেয়ার সাথে সাথে সন্তানকে তার শৈশবকাল স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আজ পিতা-মাতা তোমার যতটুকু মুখাপেক্ষী, এক সময় তুমিও তদপেক্ষা বেশী তাদের মুখাপেক্ষী ছিলে। তখন তারা যেমন নিজেদের আরাম-আয়েশও কামনা বাসনা তোমার জন্যে কোরবান করেছিলেন এবং তোমার অবুঝ কথাবার্তাকে স্নেহমমতার আবরণ দ্বারা ঢেকে নিয়েছিলেন, তেমনি মুখাপেক্ষিতার এই দুঃসময়ে বিবেক ও সৌজন্যবোধের তাগিদ এই যে, তাদের পূর্বঋণ শোধ করা কর্তব্য। أَف বাক্যে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, যদ্দারা বিরক্তি প্রকাশ পায়। এমনকি, তাঁদের কথা শুনে বিরক্তিবোধক দীর্ঘশ্বাস ছাড়াও এর অন্তর্ভুক্ত। মোটকথা, যে কথায় পিতা-মাতার সামান্য কষ্ট হয়, তাও নিষিদ্ধ। সুত্র: তাফসীরে আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত।
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের রিযক প্রশস্ত হওয়া এবং নিজের আয়ুস্কাল বৃদ্ধি হওয়া পছন্দ করে সে অবশ্যই আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখবে। -বুখারী ও মুসলিম
➧ সুতরাং তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। -সূরা লোকমান ১৪
➧ তোমরা যদি শোকর-গুজার হও [১] এবং ঈমান আন, তবে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কি করবেন? আর আল্লাহ (শোকরের) পুরস্কার দাতা, সর্বজ্ঞ। সূরা নিসা ১৪৭
ব্যাখ্যা: আয়াতে শোকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর আসল অর্থ হচ্ছে নিয়ামতের স্বীকৃতি দেয়া ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং অনুগৃহীত হওয়া। এ ক্ষেত্রে আয়াতের অর্থ হচ্ছে, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ না হও এবং তাঁর সাথে নিমকহারামী না কর; বরং যথার্থই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ও শোকর আদায়কারী হও তাহলে আল্লাহ অনর্থক তোমাদের শাস্তি দেবেন না। মোটকথা: আল্লাহ তা’আলা ঈমানদার এবং শোকরগুজারকে শাস্তি দিবেন না। [তাবারী] কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অনুগ্রহকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি কি? বস্তুতঃ হৃদয়ের সমগ্র অনুভূতি দিয়ে তার অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়া, মুখে এ অনুভূতির স্বীকারোক্তি করা এবং কার্যকলাপের মাধ্যমে অনুগৃহীত হওয়ার প্রমাণ পেশ করাই হচ্ছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক উপায়। এ তিনটি কাজের সমবেত রূপই হচ্ছে শোকর। এ শোকরের দাবী হচ্ছে প্রথমতঃ অনুগ্রহকে অনুগ্রহকারীর অবদান বলে স্বীকার করা। অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে অনুগ্রহকারীর সাথে আর কাউকে অংশীদার না করা। দ্বিতীয়তঃ অনুগ্রহকারীর প্রতি ভালবাসা, বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের অনুভূতি নিজের হৃদয়ে ভরপুর থাকা এবং অনুগ্রহকারীর বিরোধীদের প্রতি এ প্রসঙ্গে বিন্দুমাত্র ভালবাসা, আন্তরিকতা, আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার সম্পর্ক না থাকা। তৃতীয়তঃ অনুগ্রহকারীর আনুগত্য করা, তার হুকুম মেনে চলা, তার নিয়ামতগুলোকে তার মর্জির বাইরে ব্যবহার না করা। সুত্র: তাফসীরে জাকারিয়া
নোট: উপরে সূরা লোকমানের ১৪ নং আয়াতে কৃতজ্ঞ হবার নির্দেশ পালনে সূরা নিসার ১৪৭ নং আয়াতের উক্ত ব্যাখ্যা একজন মুমিনের জন্য যথেষ্ট। উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন যে, একজন কৃতজ্ঞ সন্তান কখনো পিতা-মাতার অবাধ্য হতে পারে না। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের বিপরীতে কোন আনুগত্য কোন ক্ষেত্রেই বৈধ নয়, এটা মনে রাখতে হবে।
➧ যে ব্যক্তি ভালোবাসে যে তার হায়াত বেড়ে যাক এবং তার রিযিক বেড়ে যাক, সে যেন তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং তাদের খিদমত করে এবং আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করে। -মুসনাদে আহমাদ হা/১৩৪০১, সহীহ।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা:
➧ যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক (আত্নীয়তার) অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস। -সূরা রা’দ ২৫
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী (অর্থাৎ আত্মীয় ও সম্পর্কীয় লোকদের সাথে মন্দ আচরণকারী) জান্নাতে প্রবেশ করবে না। -বুখারী, মুসলিম, মেশকাত ৪৭০৫
➧ যুলুমবাজি করা, (রক্তের) আত্নীয়তা ছিন্ন করা, খিয়ানত করা (বিশ্বাসঘাতকতা) ও মিথ্যা বলা ছাড়া এমন উপযুক্ত আর কোন পাপাচার নেই, যার শাস্তি পাপাচারীর জন্য দুনিয়াতেই আল্লাহ অবিলম্বে প্রদান করে থাকেন এবং সেই সাথে আখেরাতের জন্যও জমা করে রাখেন। আর সবচেয়ে দ্রুত সুফলদায়ী আমল হলো আনুগত্য ও আত্নীয়তার বন্ধন বজায় রাখা। এমনকি বাড়ির লোক পাপাচারী (দরিদ্র) হয়, তা সত্ত্বেও আত্নীয়তার বন্ধন বজায় রাখার ফলে তাদের ধন ও জনে বৃদ্ধি লাভ হয়। -তাবারানী, সহীহুল জামে’ ৫৭০৫
আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার প্রতিকারে আসমানী হেদায়াত
➧ যে ব্যক্তি ভালোবাসে যে তার আয়ূ বেড়ে যাক, তার রিযিক বৃদ্ধি পাক এবং সে খারাপ মৃত্যু থেকে রক্ষা পাক, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখে। -মুসনাদে আহমাদ, হা/১২১৩
ব্যাখ্যা: আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে করণীয়ঃ পিতা-মাতা ও তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত স্বজন যথা নিজ ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ফুফু, চাচা, খালা, মামা ও তাঁদের উর্ধতন ও অধস্তন বংশধরগণের সাথে সাক্ষাৎ করা, খোজ-খবর নেয়া, তাঁদের মধ্যে অভাবগ্রস্থদের আর্থিক সহায়তা করা এবং প্রয়োজনে যে কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এ সবের মাধ্যমে পারস্পারিক ঘনিষ্ট পারিবারিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সমাজের জন্য যা কল্যানকামী ও হৃদয়বান মানুষ উপহার দিতে পারে যা জীবনকে সহজ ও সুন্দর করতে সহায়ক হয়।
৫. মিথ্যা ও প্রতারনা:
➧ তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যধি। অতঃপর আল্লাহ্ তাদের ব্যধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন [১]। আর তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাবাদী। -সূরা বাকারাহ ১০
ব্যাখ্যা: মুনাফিকদের এমন দু’টি চরিত্র ছিল যে, তারা নিজেরা মিথ্যা বলত, অপরকেও মিথ্যাবাদী বলত। [ইবনে কাসীর] এর দ্বারা বোঝা যায় যে, মিথ্যা বলার অভ্যাসই তাদের প্রকৃত অন্যায়। এ বদ-অভ্যাসই তাদেরকে কুফর ও নিফাক পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। এ জন্যই অন্যায়ের পর্যায়ে যদিও কুফর ও নিফাকই সর্বাপেক্ষা বড়, কিন্তু এসবের ভিত্তি ও বুনিয়াদ হচ্ছে মিথ্যা। তাই আল্লাহ্ তা'আলা মিথ্যা বলাকে মূর্তিপূজার সাথে যুক্ত করে বলেছেন, “মূর্তিপূজার অপবিত্রতা ও মিথ্যা বলা হতে বিরত থাক”। [সূরা আল-হাজ্জ: ৩০]
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা মিথ্যা থেকে বেঁচে থাক। কেননা, মিথ্যা ঈমান দূর করে।” [মুসনাদে আহমাদ: ১/৫] -(সুত্রঃ তাফসীর আবু বকর জাকারিয়া, সংক্ষেপিত)
➧ যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ (মানুষের মধ্যে যে দোষ নেই বা যে অপরাধ মানুষ করে নি, তা তার ওপর আরোপ করা) এবং স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে। -সূরা আহযাব ৫৮
➧ যখন মুনাফিকরা আপনার কাছে আসে তখন তারা বলে, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয় আল্লাহর রসূল।’ আর আল্লাহ জানেন যে, আপনি নিশ্চয় তাঁর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। -সূরা মুনাফিকুনঃ ১
➧ নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। -সূরা মুমিন/গাফিরঃ ২৮
➧ আমি তোমাদেরকে জানাব কি, কার নিকট শয়তান অবতীর্ণ হয়? ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠের নিকট। -সূরা শু’য়ারাঃ ২২১-২২২
➧ যুলুমবাজি করা, (রক্তের বন্ধন) আত্নীয়তা ছিন্ন করা, খিয়ানত করা (বিশ্বাসঘাতকতা) ও মিথ্যা বলা ছাড়া এমন উপযুক্ত আর কোন পাপাচার নেই, যার শাস্তি পাপাচারীর জন্য দুনিয়াতেই আল্লাহ অবিলম্বে প্রদান করে থাকেন এবং সেই সাথে আখেরাতের জন্যও জমা করে রাখেন। আর সবচেয়ে দ্রুত সুফলদায়ী আমল হলো আনুগত্য ও আত্নীয়তার বন্ধন বজায় রাখা। এমনকি বাড়ির লোক পাপাচারী (দরিদ্র) হয়, তা সত্ত্বেও আত্নীয়তার বন্ধন বজায় রাখার ফলে তাদের ধন ও জনে বৃদ্ধি লাভ হয়। -তাবারানী, সহীহুল জামে’ ৫৭০৫
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে সর্বাপেক্ষা বড় গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করব না? কথাটা তিনি তিনবার বললেন। আমরা বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! অবশ্যই বলে দিন। তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা। তিনি হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন, অতঃপর তিনি সোজা হয়ে বসে আবার বলেন, সাবধান, মিথ্যা* কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষী দেয়া। তিনি কথাগুলো বারবার বলতে লাগলেন। এমনকি আমরা (মনে মনে) বলতে লাগলাম, তিনি যদি চুপ হয়ে যেতেন। -বুখারী ও মুসলিম
* মূল আরবী শব্দ ‘যুর’, যার আভিধানিক অর্থ মিথ্যা, অসত্য, জাল, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা।
➧ রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন: চারটি দোষ যাহার মধ্যে বিদ্যমান, সে খাঁটি মুনাফিক; আর যাহার মধ্যে ঐ দোষগুলোর একটি বর্তমান থাকিবে, তাহার মধ্যে মুনাফিকীর একটি স্বভাব থাকিবে যে পর্যন্ত না সে উহা পরিহার করে-ক) যখন তাহার নিকট কিছু আমানত* রাখা হয় (অর্থ, সম্পদ, দলিলাদি বা কোন দায়িত্ব বা গোপন তথ্য ইত্যাদি) তাহাতে সে খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) করে। খ) সে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে, গ) যখন ওয়াদা* করে, ভঙ্গ করে, এবং ঘ) যখন কাহারো সহিত কলহ করে, তখন সে গালাগালি ও অশ্লীল ব্যবহার করে। (বুখারী ৩৪, ২৪৫৯, মুসলিম ২১৯)
➧ নবী (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি (মিথ্যা) কসম খেয়ে কোন মুসলমানের হক মেরে নেবে, তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম ওয়াজেব এবং জান্নাত হারাম করে দেবেন। একটি লোক বলল, যদি তা নগন্য জিনিস হয় হে আল্লাহর রসূল! তিনি বললেন, যদিও তা পিল্লু গাছের একটি ডালও হয়। -মুসলিম ৩৭০
➧ আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি আমাদেরকে ধোঁকা দেয় সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। চালবাজ ও প্রতারক জাহান্নামে যাবে। -তাবারানীর কাবীর ১০০৮৬ ও সাগীর ৭৩৮, ইবনে হিব্বান ৫৬৭, ৫৫৫৯, সাহীহুল জামে’ ৬৪০৮
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, (তাকে করা প্রশ্নের জবাবে), একজন মুসলমান ভীরু ও কৃপণ হতে পারে কিন্তু মিথ্যুক হতে পারে না। -মুয়াত্তা মালেক, বাইহাকী, মা’আরিফুল হাদীস, হা/৫০
নোট:
কোন কোন ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা জায়িয?
➧ আল্লামা ইমাম নববী (রাঃ) বলেন, জেনে রেখো! মিথ্যা বলা মূলত হারাম। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে কতকগুলো শর্ত সাপেক্ষে জায়িয। সংক্ষেপে তা হলোঃ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মানুষকে কথা বলতে হয়। ভাল উদ্দেশ্য যদি মিথ্যা ছাড়া লাভ করা না যায় তবে সেক্ষেত্রে মিথ্যা বলা জায়েয। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য যদি মুবাহ হয় তবে সেক্ষেত্রে মিথ্যা বলা মুবাহ। আর যদি তা ওয়াজিব হয় তাহলে মিথ্যা বলাও ওয়াজিব। যেমন কোন যালিমের ভয়ে যে তাকে হত্যা করতে চায়, কোন মুসলমান কোন ব্যক্তির নিকটে পালিয়ে থাকে, যে তাকে হত্যা করতে চায়, অথবা ধন-সম্পদ লুট হয়ে যাওয়ার ভয়ে তা অন্যের নিকট সরিয়ে রাখে; আর জালিম যদি কারো নিকট তা জানার জন্য খোজ নেয় তখন মিথ্যা বলা ওই ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব। এমনিভাবে কারো নিকট যদি কোন আমানত গচ্ছিত থাকে আর জালেম যদি তা ছিনিয়ে নিতে চায়, তবে তা গোপন করার জন্য মিথ্যা বলা ওয়াজিব। এসব ক্ষেত্রে রূপক ভাষার মাধ্যমে কাজ উদ্ধার সম্ভব হলে, রূপক ভাষা ব্যাবহার করতে হবে। এসব কথার সাথে সঠিক উদ্দেশ্য থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সে মিথ্যুক হবে না শব্দ গুলো বাহ্যত মিথ্যার অর্থ প্রকাশ করে; বা যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে তার দিক থেকে বিচার করলে মিথ্যাই মনে হয়। যদি চতুরতা পরিহার করে সরাসরি মিথ্যা কথা বলা হয় তবু্ও তা হারাম হবে না।
এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা জায়েয হওয়ার ব্যাপারে আলেমগন উম্মে কুলসুম (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীস প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন। হাদীসটি এখানে উল্লেখ করা হলো: তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বলতে শুনেছিঃ "যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে দুই দলের মধ্যে শান্তি স্থাপন করে সে মিথ্যুক নয়। বরং সে কল্যাণ বৃদ্ধি করে কল্যাণের কথা বলে। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম তার বর্ণনায় এ কথাগুলো উল্লেখ করেছেনঃ উম্মে কুলসুম রাঃ বলেন, আমি তাকে কখনো মানুষকে চতুরতা অবলম্বন করার অনুমতি দিতে শুনি নাই। তবে তিনটি ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছেন, যুদ্ধের ব্যাপারে, মানুষের মাঝে বিবাদ মিটিয়ে সন্ধি ও শান্তি স্থাপনে এবং স্বামী-স্ত্রীর সাথে ও স্ত্রী স্বামীর সাথে কথপোকথনে। সুত্রঃ রিয়াদুস সালেহীন
৬. যিনা ব্যভিচার / অবৈধ যৌনাচার:
➧ এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করে না, আল্লাহ যাকে যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে হত্যা নিষেধ করেছেন, তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। আর যারা এগুলি করে, তারা শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন ওদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে তারা হীন অবস্থায় স্থায়ী হবে। -সূরা ফুরকান ৬৮-৬৯
➧ নবী (ﷺ) বলেন, যখনই কোন জাতি তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তখনই তাদের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যখনই কোন জাতির মাঝে অশ্লীলতা আত্নপ্রকাশ করে, তখনই সে জাতির জন্য আল্লাহ মৃত্যুকে আধিপত্য প্রদান করেন। (তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।) আর যখনই কোন জাতি যাকাত-দানে বিরত হয়, তখনই তাদের জন্য (আকাশের) বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়। -হাকেম ২৫৭৭, বাইহাকী ৬৬২৫, ১৯৩২৩, বাযযার ৩২৯৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ১০৭
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, তোমরা যে ব্যক্তিকে লুত নবীর উম্মতের মত সমকামে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও তার সহকর্মীকে হত্যা করে ফেলো। -আহমাদ ২৭৩২, আবু দাউদ ৪৪৬৪, তিরমিযী ১৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২৫৬১, বাইহাকী ১৭৪৭৫, সহীহুল জামে’ ৬৫৮৯
➧ নবী (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তিকে কোন পশু-সঙ্গমে লিপ্ত পাবে, সে ব্যক্তি ও সে পশুকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে। -তিরমিযী ১৪৫৫, ইবনে মাজাহ ২৫৬৪, হাকেম ৮০৪৯, বাইহাকী ১৭৪৯১, ১৭৪৯২, সহীহুল জামে’ ৬৫৮৮
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, আল্লাহ (কিয়ামতের দিন) সেই ব্যক্তির দিকে চেয়েও দেখবেন না, যে ব্যক্তি কোন পুরুষের মলদ্বারে অথবা কোন স্ত্রীর পায়খানা-দ্বারে সঙ্গম করে। -তিরমিযী ১১৬৫, নাসাঈর কুবরা ৯০০১, ইবনে হিব্বান ৪৪১৮, সহীহুল জামে’ ৭৮০১
➧ নবী (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি কোন ঋতুমতী স্ত্রী (মাসিক অবস্থায়) সঙ্গম করে অথবা কোন স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে, অথবা কোন গনকের নিকট উপস্থিত হয়ে (সে যা বলে তা) বিশ্বাস করে, সে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (ﷺ) এর অবতীর্ণ কুরআনের সাথে কুফরী করে (অর্থাৎ কুরআনকেই সে অবিশ্বাস ও অমান্য করে। কারণ, কুরআনে এ সব কুকর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে) । -আহমাদ ৯২৯০, আবু দাউদ ৩৯০৬, তিরমিযী ১৩৫, ইবনে মাজাহ ৬৩৯, বাইহাকী ১৪৫০৪
➧ ইবনে মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) তাঁর প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, মহাপাপ হল, আল্লাহর সমকক্ষ কাউকে নির্ধারণ করা, তোমার সন্তান তোমার সাথে আহার-বিহারে অংশ নেবে এ আশংকায় সন্তানকে হত্যা করা এবং তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া। -বুখারী ও মুসলিম
➧ রসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নিজ প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার করা সাধারণ ১০ নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করার চেয়ে ভয়ংকর।’ [ মুসনাদ আহমাদ৬/৮; সহিহ তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস : ২৪০৪ ]
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, জিবরাঈল ও মিকাঈল আঃ আমার কাছে এলেন এবং আমি তাদের সাথে পথ চলতে শুরু করলাম। এক পর্যায়ে আমরা বড় একটা চুল্লির কাছে এসে পৌঁছলাম। সে চুল্লির উপরি অংশ সংকীর্ণ ও নিম্নভাগ প্রশস্ত। ভেতরে বিরাট চিৎকারও শোনা যাচ্ছিল। আমরা চুল্লিটার ভেতরে দেখতে পেলাম উলংগ নারী ও পুরুষদেরকে। তাদের নিচ থেকে কিছুক্ষন পর পর আগুনের এক একটা হলকা আসছিলো আর তার সাথে সাথে আগুনের তীব্র দহনে তারা প্রচণ্ডভাবে চিৎকার করছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! এরা কারা? তখন তিনি বললেন, এরা ব্যভিচারী নারী ও পুরুষ। -বুখারী
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তিন ধরনের লোকের সাথে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেনও না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তারা হলঃ ১. বৃদ্ধ ব্যভিচারী, ২. মিথ্যাবাদী শাসক ও ৩. অহংকারী দরিদ্র। -মুসলিম
যিনা ব্যভিচার / অবৈধ যৌনাচারের প্রতিকারে আসমানি দিক নির্দেশনা (হিদায়াত):
➧ আর তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন’ তাদের বিয়ে সম্পাদন কর (এটা অভিভাবকদের প্রতি নির্দেশ) এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্থ হলে আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন; আল্লাহ্তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। সূরা নূর, আয়াত নং ৩২
ব্যাখ্যা: মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) হযরত ওকাফ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার স্ত্রী আছে কি? তিনি বললেনঃ না! আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কোন শরীয়তসম্মত বাঁদী আছে কি? উত্তর হল না। প্রশ্ন হলঃ তুমি কি আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যশীল? উত্তর হলঃ হ্যাঁ। উদ্দেশ্য এই যে, তুমি কি বিবাহের প্রয়োজনীয় ব্যয়নির্বাহের সামর্থ্য রাখ? তিনি উত্তরে হাঁ বললে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তাহলে তো তুমি শয়তানের ভাই। তিনি আরও বললেনঃ বিবাহ আমাদের সুন্নত। আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি নিকৃষ্টতম, যে বিবাহহীন এবং তোমাদের মৃতদের মধ্যে সে সর্বাধিক নীচ, যে বিবাহ না করে মারা গেছে। -(মাযহারী)
ইবনে আবী হাতেম বর্ণনা করেন, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একবার মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ তোমরা বিবাহের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ পালন কর। তিনি যে ধনাঢ্যতা দান করার ওয়াদা করেছেন, তা পূর্ণ করবেন। অতঃপর তিনি সূরা নূরের উক্ত আয়াত পাঠ করলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ তোমরা যদি ধনী হতে চাও, তবে বিবাহ কর। অতঃপর উক্ত আয়াত উদ্ধৃত করেন। তবে উক্ত ওয়াদা তখন, যখন পবিত্রতা সংরক্ষণ ও সুন্নত পালনের নিয়তে বিবাহ করা হয় এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও ভরসা করা হয়। সূত্রঃ তাফসীরে মা'আরেফুল-কোরআন (সংক্ষেপিত)
➧ আল্লাহর নবী (ﷺ) বলেন, হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা উহা চক্ষুকে আনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষা করে; আর যে সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোজা রাখে, রোজা হইল তাহার জন্য খোজা হওয়া। -বুখারী ও মুসলিম, মেশকাত ২৯৪৬
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, গোটা দুনিয়াটাই হইল সম্পদ আর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হইল সাধ্বী নারী। -মুসলিম, মেশকাত ২৯৪৯
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেন, পুরুষের পক্ষে নারী অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর বিপদের জিনিস আমি আমার পরে কিছু রাখিয়া যাইতেছি না। -বুখারী ও মুসলিম, মেশকাত ২৯৫১
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, দুনিয়া হইতেছে সুস্বাদু ঘাস স্বরূপ, আর আল্লাহ তোমাদিগকে উহাতে (একের পর এককে) প্রতিনিধি করিবেন, যাহাতে তিনি দেখেন যে, তোমরা কিভাবে কাজ কর। অতএব তোমরা দুনিয়া সম্পর্কে সতর্ক হও এবং সতর্ক হও নারী জাতি সম্পর্কে। কেননা, বনি ইসরাইলের প্রতি যে প্রথম বিপদ আসিয়াছিল তাহা নারীদের ভিতর দিয়াই আসিয়াছিল। -মেশকাত ২৯৫৩
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, যখন বান্দা বিবাহ করিল তাহার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করিল, এখন বাকি অর্ধেক সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করিবে। -বাইহাকী, মেশকাত ২৯৬২
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, দোয়া ব্যতীত অন্য কিছুই তকদীরকে ফিরাইতে পারে না। পুন্য ব্যতীত কোন কিছুই আয়ুকে বাড়াইতে পারে না, আর কৃত পাপই মানুষকে জীবিকা হইতে বঞ্চিত করে। -ইবনে মাজাহ
➧ নবী (ﷺ) বলেছেন, দোযখকে কামনা-বাসনা দ্বারা ঢাকিয়া রাখা হইয়াছে। আর জান্নাতকে ঢাকিয়া রাখা হইয়াছে বিপদ-মুসিবত দ্বারা। -মুত্তাফাঃ।
➧ রাসুলে কারীম (ﷺ) বলেছেন, সে ব্যক্তিই সফলকাম হইয়াছে, যে ইসলাম গ্রহণ করিল এবং তাহাকে প্রয়োজনমাফিক রিযক প্রদান করা হইল এবং আল্লাহ তাহাকে যাহা দিয়াছেন তাহাতে সন্তুষ্ট রাখিয়াছেন। -মুসলিম
➧ আল্লাহর নবী (ﷺ) বলেন, অন্যান্য ফরজের সঙ্গে হালাল কামাই-এর ব্যবস্থা গ্রহণও একটি ফরজ। -যয়ীফ, সিলসিলাহ যয়ীফাহ, বাইহাকী
➧ যে জাতির মাঝে অশ্লীলতা (ব্যাভিচার) প্রকাশ পাবে, সে জাতির মাঝেই মৃত্যু ব্যাপক হবে । তারগীব ৭৬০, তাবারানী
উপরোক্ত হাদীসের শিক্ষার আলোকে বিশেষ করে পুত্রসন্তানদের বৈধ জীবিকার্জনে তৎপর হওয়া একান্ত কর্তব্য এবং বিবাহে অযথা বিলম্ব না করা উচিত। এতদসঙ্গে পিতা-মাতা/অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের যথাশীঘ্র বিবাহ সম্পাদনের ব্যপারে সক্রিয় ভুমিকা পালন করা। তাহলে আশা করা যায় যে অবৈধ যৌনাচারের আপদ-বিপদ ফিতনা থেকে তারা এবং মানব সমাজ অধিকতর নিরাপদ থাকবে ইনশাআল্লাহ।
৭. মদ্যপান:
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে (কিছু লোককে) মাটি ধসিয়ে, পাথর বর্ষণ করে এবং আকার বিকৃত করে (ধ্বংস করা) হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে। -ইবনে আবিদ দুনিয়া, সহীহুল জামে’ ৫৪৬৭
➧ নবী (ﷺ) বলেন, মদ হল যাবতীয় অশ্লীলতার প্রধান এবং সবচেয়ে বড় পাপ। যে ব্যক্তি তা পান করলো, সে যেন নিজ মা, খালা ও ফুফুর সাথে ব্যভিচার করলো। -তাবারানী, সহীহুল জামে’ ৩৩৪৫
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, তিন শ্রেণীর লোকের জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, আব্যাহতভাবে মদ পানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্যজন এবং এমন বেহায়া, যে তার পরিবারের অশ্লীলতাকে মেনে নেয়। -আহমাদ ৫৩৭২, ৬১১৩
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেন, প্রত্যেক প্রমত্ততা (জ্ঞানশুন্যতা) আনয়নকারী বস্তুই হল মদ এবং প্রত্যেক প্রমত্ততা আনয়নকারী বস্তুই হল হারাম। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করতে করতে তাতে অভ্যস্ত হয়ে মারা যায়, সে ব্যক্তি আখেরাতে (জান্নাতে পবিত্র) মদ পান করতে পাবে না। (বেহেস্তে যেতে পারবে না) – বুখারী ৫৫৭৫, মুসলিম ৫৩৩৬
➧ আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেছেন, তুমি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না – যদিও (এ ব্যাপারে) তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ফরয নামাজ ত্যাগ করো না। কারণ যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নামাজ ত্যাগ করে, তার উপর থেকে (আল্লাহর) দায়িত্ব উঠে যায়। আর মদ পান করো না, কারণ মদ হলো প্রত্যেক অমঙ্গলের (পাপাচারের) চাবিকাঠি। -ইবনে মাজাহ ৩২৫৯, ৪০৩৪
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেন, মদ যাবতীয় নোংরামির মূল। যে কেউ তা পান করবে, তার ৪০ দিনের নামাজ কবুল হবে না। যে ব্যক্তি তার মুত্রথলিতে ঐ মদের কিছু পরিমাণ রাখা অবস্থায় মারা যাবে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে এবং যে কেউ তা নিজ পেটে রেখে মারা যাবে, সে জাহেলী যুগের মরণ মরবে। তাবারানী ১৫৪৩, দারাকুতনী ৪/২৪৭
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আর তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না; পিতা-মাতার নাফরমান সন্তান, মদ্যপানে অভ্যস্ত মাতাল এবং দান করার পর যে বলে ও গর্ব করে বেড়ায় এমন খোঁটাদানকারী ব্যক্তি। আহমাদ ৬১৮০, নাসাঈর কুবরা ২৩৪৩, হাকেম ২৫৬২, সহীহুল জামে’ ৩০৭১
৮. অহংকার করা:
➧ অহমিকা হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা। -মুসলিম ১৬৭, আবু দাউদ ৪০৪৮
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আমার প্রতি অহী প্রেরণ করেছেন যে, বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন কর, যার ফল এই হওয়া চাই যে, কেউ কারো উপর অবিচার করবে না এবং কেউ কারো উপর অহংকার করবে না। -মুসলিম ৭৩৮৯, হাদীস সম্ভার ৩৪৩৮, আবু দাউদ
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেন, আমি কি তোমাদের জাহান্নামীদের সম্পর্কে জানাবো না? তারা হলঃ প্রত্যেক অবাধ্য, দুশ্চরিত্র ও অহংকারী লোক। -বুখারী ও মুসলিম
➧ এ পরলোকের আবাস; যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। -সূরা আল-কাসাসঃ ৮৩
ব্যাখ্যা: عُلُوّ এর অর্থ যুলুম ও ঔদ্ধত্য করা, নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করা, গর্ব ও অহংকার করা। আর فَسَاد এর অর্থঃ অন্যায়ভাবে অন্যের মাল নিয়ে নেওয়া, পাপাচারে লিপ্ত হওয়া। এই দু'টি কারণে পৃথিবীতে ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। আর যারা পরহেযগার ও সাবধানী তাদের কর্ম ও চরিত্র উক্ত সকল পাপ হতে পবিত্র থাকে। তাদের চরিত্র অহংকারের পরিবর্তে বিনয় ও পাপাচারের বদলে আল্লাহর আনুগত্যে পরিপূর্ণ থাকে। আর আখেরাতের ঘরঃ অর্থাৎ, জান্নাত ও শুভ পরিণাম তাদেরই ভাগ্যে জুটবে।
➧ এইভাবে আল্লাহ প্রত্যেক উদ্ধত ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন। -সূরা মুমিন/গাফিরঃ ৩৫
➧ যখন ফিরিশতাদেরকে বললাম, ‘আদমকে সিজদাহ কর।’ (১) তখন সকলেই সিজদাহ করল; কিন্তু ইবলীস সিজদাহ করল না; সে অমান্য করল (২) ও অহংকার প্রদর্শন করল। সুতরাং সে অবিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হল। -সূরা বাকারাহঃ ৩৪
➧ ওদেরকে বলা হবে, জাহান্নামে স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য তোমরা ওতে প্রবেশ কর। কত নিকৃষ্ট অহংকারীদের আবাসস্থল! – সূরা যুমারঃ ৭২
৯. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া:
➧ রসূল (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর কসম! সে মু’মিন নয়, আল্লাহর কসম! সে মু’মিন নয়, আল্লাহর কসম! সে মু’মিন নয়। বলা হল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! সে ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে (শাস্তি ছাড়া) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
➧ আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, ১) আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা থেকে বেঁচে থাক, এতে তুমি হবে উত্তম ইবাদতকারী। ২) আল্লাহ তোমার কিসমতে যা বণ্টন করেছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে, এতে তুমি হবে সর্বাপেক্ষা ধনবান। ৩) তোমার প্রতিবেশীর সাথে সৎ ব্যবহার করবে, এতে তুমি হবে পূর্ণ ঈমানদার। ৪) নিজের জন্য যা পছন্দ কর, মানুষের জন্যও তা পছন্দ করবে, তখন তুমি হবে পূর্ণ মুসলমান। এবং ৫) অধিক হাসবে না। কেননা, অধিক হাসি অন্তরকে মেরে ফেলে। -আহমাদ, তিরমিযী সহীহ
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়ার প্রতিকারে আসমানী হেদায়াত:
➧ আবু আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, “সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! কোন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার প্রতিবেশী অথবা (কোন) ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করেছে, যা সে নিজের জন্য করে।” (মুসলিম ১৮০)
➧ আবু আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রসূল (ﷺ) বলেছেন, “সে আমার প্রতি ঈমান আনে নি, যে ব্যক্তি পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রিযাপন করে, অথচ তাঁর প্রতিবেশী ক্ষুধার্থ থাকে এবং এ কথা সে জানে।” (বাযযার, ত্বাবারানী ৭৫০, সহীহুল জামে ৫৫০৫)
১০. ওয়াদা, অঙ্গীকার ও চুক্তি ভঙ্গ করা:
➧ হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর। -সূরা মায়িদাহঃ ১
ব্যাখ্যা: দুই পক্ষ (ব্যক্তি, দল, রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান) যদি ভবিষ্যতে কোন কাজ করা বা না করার বাধ্যবাধকতায় একমত হয়ে যায়, তবে একেই অঙ্গীকার বা চুক্তি বলা হয়। যেমনঃ বিবাহ-শাদী, লেনদেন, ব্যবসা, ইজারা, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তি ইত্যাদি। চুক্তির যত প্রকার রয়েছে সবই আয়াতে উল্লেখিত উক্কুদ শব্দের অন্তর্ভুক্ত। এরূপ চুক্তি পূর্ণ করা ফরয বা অপরিহার্য এবং এর খেলাপ করা বিশ্বাসঘাতকতা প্রতারণা তথা অবৈধ বা হারাম। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ তা পূর্ণ করার জন্য আদালতের মাধ্যমেও বাধ্য করতে পারে। দ্বিতীয় প্রকার অঙ্গীকার কে ওয়াদা বলা হয় যা একতরফাভাবে একজন অন্যজনকে কিছু দেয়ার বা কাজ করে দেয়ার ওয়াদা করা যা পূর্ণ করাও শরীয়তের আইনে জরুরী ও ওয়াজিব এবং শরীয়ত সম্মত ওজর ব্যতিত এর খেলাপ করা গুনাহ। যদিও আদালতের মাধ্যমে তা পূর্ণ করতে বাধ্য করা যায় না। এছাড়া আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের কাছ থেকে ঈমান ও ইবাদত তথা স্বীয় নাযিলকৃত বিধি-বিধান হালাল ও হারাম সম্পর্কিত যে সব অঙ্গীকার নিয়েছেন তা মেনে চলাও অবশ্য কর্তব্য। সুত্রঃ তাফসীর মা’আরিফুল কুরআন, সূরা আল-মু’মিনুন আয়াত ৮ ও উক্ত আয়াত এর ব্যাখ্যার আলোকে (সংক্ষেপিত) ।
নোট: উল্লেখ্য, মিথ্যাচার (প্রতারণা জালিয়াতি যার অন্য রূপ), আমানতের খেয়ানত এবং ওয়াদা অঙ্গীকার (চুক্তি) ভঙ্গ করা মানব সমাজে কলহ বিবাদ, অশান্তি, মামলা মোকদ্দমা ও যুদ্ধ বিগ্রহের প্রধান কারণ সমুহের অন্যতম।
➧ আর প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে। -সূরা বনী ইস্রাঈলঃ ৩৪
➧ শয়তানের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি প্রতারণা মাত্র (মানবরূপী শয়তানের প্রতিশ্রুতিও তদ্রুপ) । -সূরা নি(ﷺ) ১২০
➧ যারা অঙ্গীকার দিয়ে তা পূর্ণ করবে, অর্থ-সংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে। তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী। -সূরা বাকারাহঃ ১৭৭
➧ আর তোমরা আল্লাহ্র অঙ্গীকার তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করো না। আল্লাহ্র কাছে যা আছে তা-ই তোমাদের জন্য উত্তম---যদি তোমরা জানতে! (সূরা আন-নাহল, আয়াত নং ৯৫)
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, যে সকল শর্ত তোমাদের জন্য পালন করা জরুরী, তন্মধ্যে সব চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল তাই যার দ্বারা তোমরা তোমাদের (পরস্পরের) গোপনাঙ্গ হালাল করে থাক (অর্থাৎ স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করা) । -বুখারী ২৭২১, ৫১৫১, মুসলিম ৩৫৩৭, মিশকাত ৩১৪৩
➧ রসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন: চারটি দোষ যাহার মধ্যে বিদ্যমান, সে খাঁটি মুনাফিক; আর যাহার মধ্যে ঐ দোষগুলোর একটি বর্তমান থাকিবে, তাহার মধ্যে মুনাফিকীর একটি স্বভাব থাকিবে যে পর্যন্ত না সে উহা পরিহার করে-ক) যখন তাহার নিকট কিছু আমানত* রাখা হয় (অর্থ, সম্পদ, দলিলাদি বা কোন দায়িত্ব বা গোপন তথ্য ইত্যাদি) তাহাতে সে খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) করে। খ) সে যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে, গ) যখন ওয়াদা* করে, ভঙ্গ করে, এবং ঘ) যখন কাহারো সহিত কলহ করে, তখন সে গালাগালি ও অশ্লীল ব্যবহার করে। (বুখারী ৩৪, ২৪৫৯, মুসলিম ২১৯)
➧ মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিরা অবশ্যই দোযখের সর্বনিমন স্তরে অবস্থান করবে এবং তাদের জন্য তুমি কখনও কোন সাহায্যকারী পাবে না। -সূরা নি(ﷺ) ১৪৫
➧ আবু সাঈদ খুদরী রাঃ হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের পাছায় একটা পতাকা থাকবে, যাকে তার বিশ্বাসঘাতকতা অনুপাতে উঁচু করা হবে। জেনে রেখো! রাষ্ট্রনায়ক (বিশ্বাসঘাতক হলে তার চেয়ে) বড় বিশ্বাসঘাতক আর অন্য কেউ হতে পারে না। মুসলিম ৪৬৩৫
➧ আনাস রাঃ বলেন, আল্লাহর নবী (ﷺ) প্রায় খুতবাতে বলতেন, যার আমানতদারী নেই, তার ঈমান নেই। আর যে অঙ্গীকার পালন করে না, তার দ্বীন নেই। আহমাদ, বায়হাকী, সহীহুল জামে’ ৭১৭৯
১১. তাকদীর অস্বীকার করা:
➧ তিন ব্যক্তির নিকট হতে আল্লাহ ফরজ-নফল কিছুই গ্রহণ করবেন না; পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, দান করে প্রচারকারী এবং তাকদীর অস্বীকারকারী ব্যক্তি। -তাবারানী ৭৫৪৭, সহীহুল জামে’ ৩০৬৫
➧ রসূল (ﷺ) বলেন, তুমি যদি আল্লাহর পথে উহুদ পাহাড় সমান সোনা ব্যয় কর, তবে তা আল্লাহ ততক্ষন পর্যন্ত গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ না তুমি ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনবে। আর জানবে যে, যা তোমার নিকট পৌছবে, তাতে ভুল হবে না এবং যা তোমার ব্যাপারে ভুলে যাওয়া হয়েছে (অর্থাৎ, যে সুখ-দুঃখ তোমার ভাগ্যে নেই) তা তোমার নিকট পৌঁছবে না। এর বিপরীত বিশ্বাসের উপর তোমার মৃত্যু হলে, তুমি অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। -আহমাদ ২১৫৮৯, ২১৬১১, আবু দাউদ ৪৭০১, বাইহাকী ২০৬৬৩, ইবনে হিব্বান ৭২৭
➧ মহানবী (ﷺ) বলেছেন, প্রত্যেক উম্মতের মাঝে মজুস (অগ্নিপূজক সম্প্রদায়) আছে। আর আমার উম্মতের মজুস তারা, যারা বলে, তাকদীর বলে কিছু নেই। ওরা যদি রোগাক্রান্ত হয় তাহলে ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করো না এবং ওরা মরলে ওদের জানাযায় অংশ গ্রহণ করো না। -আহমাদ ৫৫৮৪, সহীহুল জামে’ ৫০৩৯
নোট: পৃথিবীতে মু’মিনগণ তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত যে সব বস্তু অর্জন করতে পারেননি, সেজন্য তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করবেন না, কারণ তাঁরা জানেন যে, এসব কিছু আল্লাহর ফায়সালা ও ভাগ্যের ব্যাপার। তাতে তাঁদের অন্তর রুষ্ট হয় না; বরং তাঁদের অন্তর আল্লাহর ফায়সালার উপর খুশি ও সন্তুষ্ট থাকে। সুত্রঃ তাফসীর আহসানুল বায়ান, সূরা ইউনুসঃ ৬২ (সংক্ষেপিত)
তাকদীর অস্বীকার করার প্রতিকারে আসমানী হেদায়াত:
➧ মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং যে দান করে ও আল্লাহকে ভয় করে। এবং সৎ বিষয়কে সত্য জ্ঞান করে। অচিরেই আমি তার জন্য সুগম করে দেব (জান্নাতের) সহজ পথ। পক্ষান্তরে যে কার্পণ্য করে ও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে। আর সৎ বিষয়কে মিথ্যা জ্ঞান করে। অচিরেই তার জন্য আমি সুগম করে দেব (জাহান্নামের) কঠোর পরিণামের পথ’। -(সূরা লাইল, ৫-১০)
ব্যাখ্যা: তাফসীরকারকদের মতে, উপরোক্ত আয়াতগুলোতে তাকদীরের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া আছে। -সুত্রঃ তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া।
নোট: উক্ত আয়াতের আলোকে বুঝা যায় যে মানুষ দু'প্রকারের কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে জান্নাত-জাহান্নামের পাথেয় সংগ্রহ করে চলেছে। শুভ পরিণাম চাইলে অবিলম্বে খাঁটি তওবা করতে হবে, ঈমান ও আমলের সংশোধন করে জীবনাচরণ আল্লাহর মর্জি মাফিক করতে হবে, নইলে তাকদীর কে দোষারোপ করে মুক্তি মিলবে না।
➧ হে ঈমানদারগণ ! তোমরা সাহায্য চাও সবর [১] ও সালাতের মাধ্যমে। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে আছেন। (সূরা বাকারাহ ১৫৩)
ব্যাখ্যাঃ [১] ‘সবর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও নফস্ এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় ‘সবর’-এর তিনটি শাখা রয়েছে। (এক) নফসকে হারাম এবং না-জায়েয বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা (দুই) ইবাদাত ও আনুগত্যে বাধ্য করা এবং (তিন) যেকোন বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা। অর্থাৎ যেসব বিপদ-আপদ এসে উপস্থিত হয়, সেগুলোকে আল্লাহ্র বিধান বলে মেনে নেয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহ্র তরফ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির আশা রাখা। [ইবনে কাসীর]। ‘সবর’-এর উপরোক্ত তিনটি শাখাই প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। সাধারণ মানুষের ধারণা সাধারণতঃ তৃতীয় শাখাকেই ‘সবর’ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রথম দুটি শাখা এ ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, সে ব্যাপারে মোটেও লক্ষ্য করা হয় না। এমনকি এ দুটি বিষয়ও যে ‘সবর’-এর অন্তর্ভুক্ত এ ধারণাও যেন অনেকের নেই। কুরআন হাদীসের পরিভাষায় ধৈর্যধারণকারী বা সাবের সে সমস্ত লোককেই বলা হয়, যারা উপরোক্ত তিন প্রকারেই ‘সবর’ অবলম্বন করে।
[২] সালাত এবং ‘সবর’-এর মাধ্যমে যাবতীয় সংকটের প্রতিকার হওয়ার কারণ এই যে, এ দু’পন্তায়ই আল্লাহ্ তা'আলার প্রকৃত সান্নিধ্য লাভ হয়। আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে আছেন বাক্যের দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সালাত আদায়কারী এবং সবরকারীগণের আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ হয়। মহান আল্লাহ্ আরশের উপর থেকেও তাঁর বান্দাদের সাথে থাকার অর্থ দুটি। প্রথম, সাধারন অর্থে ‘সাথে থাকা’। যা সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর তা হচ্ছে, সবাই মহান আল্লাহ্র জ্ঞানের ভিতরে থাকা। মহান আল্লাহ্র যত সৃষ্টি সবার যাবতীয় অবস্থা তাঁর গোচরিভূত। তিনি ভাল করেই জানেন কে কোথায় কোন অবস্থায় কোন কাজে লিপ্ত। দ্বিতীয় প্রকার ‘সাথে থাকা’ বিশেষ অর্থে। যা কেবলমাত্র তাঁর নেককার, সবরকারী, ইহসানকারী, মুত্তাকীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর সেটি হচ্ছে, সাহায্য-সহযোগিতা করা। মহান আল্লাহ্র পক্ষে কারও সাথে থাকার অর্থ কখনো এটা হতে পারে না যে, তিনি তার সাথে চলাফেরা করছেন বা কোন কিছুর ভিতরে প্রবেশ করে আছেন। অথবা তার সাথে লেগে আছেন। কারণ; মহান আল্লাহ্ তাঁর আরশের উপর রয়েছেন। তিনি স্রষ্টা হিসেবে সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। (তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া)
➧ …ধৈর্যশীলদেরকেই তো তাদের পুরস্কার পূর্ণরূপে দেয়া হবে বিনা হিসেবে । (সূরা যুমার ১০)
১২. যাকাত আদায় না করা:
➧ হে মুমিনগণ! নিশ্চয় অনেক পন্ডিত-পুরোহিত মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায় উপায়ে ভক্ষণ করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে থাকে। আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে ঐগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তা দিয়ে তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশ দাগা হবে, (আর বলা হবে) এ হচ্ছে তাই যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছিলে। সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চিত জিনিসের স্বাদ গ্রহণ কর। -সূরা আত-তাওবাহঃ ৩৪-৩৫
➧ আল্লাহ যাকে ধন-মাল দিয়েছেন, সে যদি তার যাকাত না দেয় তাহলে কিয়ামতের দিন তা মাথায় লোমশুন্য, দু চোখে দুটি কাল চিহ্ন বিশিষ্ট একটি বিষধর অজগরের রূপ ধারণ করবে। সে সাপ ঐ কৃপণ ব্যক্তির গলা পেঁচিয়ে ধরে দু চোয়ালে বিষদাঁত বসিয়ে দিয়ে বলবে, আমি তোর ধন-মাল, আমিই তোর সঞ্চয়। অতঃপর, নবী (ﷺ) এই আয়াতটি পাঠ করলেন, যারা আল্লাহর দেয়া ধন-মালে কার্পণ্য করে, তারা যেন মনে না করে যে, তাদের জন্য তা কল্যাণকর, বরং তা তাদের জন্য খুবই খারাপ। তারা যে মাল নিয়ে কার্পণ্য করছে তাই কেয়ামতের দিন তাদের গলার বেড়ি হবে। -বুখারী
➧ আমাদিগকে নামাজ কায়েম করার এবং যাকাত দেবার হুকুম করা হয়েছে। যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে কিন্তু যাকাত দেয় না তার নামাজ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। -মুসনাদে আহমাদ, তারগীব ওয়াত তারহীব, তিবরানী
রসূল (ﷺ) বলেছেন; যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারী কিয়ামত দিবসে জাহান্নামে যাবে। -ত্ববারানী, হাসান সহীহ, সহীহ্ তারগীব, হা/৭৬২।
➧ হুযায়ফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, “ইসলামের অংশ আটটি। ইসলাম একটি অংশ (অর্থাৎ ইসলামে দীক্ষিত হতে কালেমা শাহাদাৎ/তাইয়্যেবাহ এর সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তি প্রদান করা) । সালাত একটি অংশ। যাকাত একটি অংশ। সিয়াম একটি অংশ। আল্লাহর ঘরের হজ্জ পালন একটি অংশ। সৎ কাজের আদেশ একটি অংশ। অসৎ কাজের নিষেধ একটি অংশ। আল্লাহর পথে জিহাদ একটি অংশ। যার মধ্যে কোন অংশ নেই সে ক্ষতিগ্রস্থ।” -(হাদীসটি বাযযার মারফু’ সুত্রে বর্ণনা করেন হা/৮৭৫, আবু ইয়ালা হা/৫২৩, তারগীব ও তারহিব হা/৭৪১, সিলসিলা সহীহা হা/৩৩৩)
নোট: উক্ত হাদীসে ইসলামের মৌলিক আটটি ইবাদতের বিষয় বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আগ্রহী পাঠক নির্ভরযোগ্য বিষয়ভিত্তিক কিতাব পাঠ করে প্রতিটি বিষয় জেনে নিয়ে আমল করতে পারেন।
যাকাত আদায় না করার প্রতিকারে আসমানী হেদায়াত:
➧ ওকবা ইবনু আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই দান কবরের শাস্তিকে মিটিয়ে দেয় এবং ক্বিয়ামতের দিন মুমিন তাঁর দানের ছায়াতলে ছায়া গ্রহণ করবে।” (ত্বাবারানী, মু’জামুল কাবীর, সিলসিলা সহীহাহ ১৮১৬, ৩৪৮৪, তারগীব ৩৫৬১)
➧ কিন্তু তোমরা আল্লাহ্র মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য যে যাকাত দিয়ে থাক, তাই বৃদ্ধি পেয়ে থাকে; সুতরাং ওরাই সমৃদ্ধিশালী। (সুরা আর-রুম, আয়াত নং ৩৯)
➧ বল, ‘আমার প্রতিপালক তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার জীবিকা বর্ধিত করেন অথবা সীমিত করেন। তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার বিনিময় দেবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা।’ (সূরা আস-সাবা, আয়াত নং ৩৯)
➧ কে আছে যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ (তাঁর পথে দান করা)? তাহলে তিনি তা বহুগুণে তার জন্য বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা আল হাদীদ, আয়াত নং ১১)
➧ যে ব্যক্তি তার মালের যাকাত আদায় করে, সে ব্যক্তির নিকট থেকে তার অনিষ্ট দূর হয়ে যায়। (ত্বাবারানী, ইবনে খুযাইমাহ, হাকেম, সহীহ তারগীব ৭৪০)
➧ নবী (ﷺ) বলেন, “তোমরা দান-সদকার মাধ্যমে অসুস্থদের চিকিৎসা কর।” (আবু দাঊদ ১০৫, ত্বাবারানী ও বায়হাকী ৩৫৫৭)
➧ আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে সম্পদ বৃদ্ধি পেয়ে উপচে না পড়বে, এমনকি সম্পদের মালিকগণ তার সদকা কে গ্রহণ করবে তা নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। যাকেই দান করতে চাইবে সে-ই বলবে, প্রয়োজন নেই। (সহিহ বুখারী ১৪১২)
বুখারীর ১৪১০ নং হাদীসে অনুরূপ বর্ণনার প্রথমেই “তোমরা সদকা কর” এ কথা বলা হয়েছে।
➧ উম্মে সালমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মানুষের প্রতি করুণা প্রদর্শন (কল্যান করা) বিপদের কাছে ধরাশয়ী হতে রক্ষা করে। গোপন সদকা পালনকর্তার ক্রোধকে নিভিয়ে দেয়। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা বয়স বৃদ্ধি করে। প্রতেকটি নেক কাজ একটি সদকা। দুনিয়ার নেক লোকেরাই আখেরাতে নেক কর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। দুনিয়ার অসৎ লোকেরাই আখেরাতে অসৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। নেক লোকেরাই জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশ করবে।” (ত্বাবারানী)
➧ আল্লাহ্ সাত শ্রেণির মানুষকে তার ছায়ায় স্থান দিবেন যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতিত আর কোন ছায়া থাকবে না- যাদের অন্যতম যে লোক এমন গোপনে সদকা করে (ফরয বা নফল) যে তার ডান হাত কি দান করে বাম হাত তা জানতে পারে না। (সহীহ বুখারী ৬৬০, মুসলিম ১০৩১)
➧ মহানবী সাঃ বলেন, যখনই কোন ব্যক্তি তার যাকাত বের করে, তখনই সে তার দ্বারা ৭০ টি শয়তানের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেয় । - আহমাদ ৫/৩৫০, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২৬৮, ইবনে খুযাইমা, হাকেম, তাবারানী ।
১৩. আত্নহত্যা:
➧ নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন পাহাড় হতে নিজেকে ফেলে আত্নহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে ফেলে অনুরূপ শাস্তিভোগ করবে। যে বিষ খেয়ে আত্নহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও সর্বদা চিরকালের জন্য বিষ পান করে যাতনা ভোগ করবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহখণ্ড (ছুরি ইত্যাদি) দ্বারা আত্নহত্যা করবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামেও ঐ লৌহখণ্ড দ্বারা সর্বদা ও চিরকালের জন্য নিজেকে আঘাত করে যাতনা ভোগ করতে থাকবে। -বুখারী ৫৭৭৮, মুসলিম ৩১৩
নোট: পার্থিব জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী, এখানে মানুষ যা চায় তাই সে সব সময় পাবেনা। ক্ষুধা, রোগ ব্যধি, ভয়-ভীতি, ফল ফসলের ও বিভিন্ন আর্থিক ক্ষতির মাধ্যমে পৃথিবীতে মানুষের ঈমানের পরীক্ষা নেয়া হবে। এসব সাময়িক বিরূপ পরিস্থিতিতে কেউ আত্নহত্যা করলে সেটা হবে জীবন যুদ্ধে চরম পরাজয় বরণ করা যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সে আলোকে আমাদের স্নেহের সন্তানসহ মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করা অভিভাবক, ঈমাম ও দায়ী ব্যক্তিদের কর্তব্য।
১৪. আল্লাহর দণ্ডবিধি কায়েমে বাধাদান করা:
➧ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত (খুনী দ্বারা) খুন হবে, সেই খুনীকে খুনের বদলে খুন করা হবে। অতঃপর যে ব্যক্তি খুনী ও দণ্ডের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সকল মানুষের অভিশাপ। -আবু দাউদ ৪৫৯৩, নাসাঈ ৪৪৫৬, ইবনে মাজাহ ২১৩১
➧ নবী (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ে নিজ গোত্রকে সহযোগিতা করে (সর্বনাশিতায়) সে ব্যক্তির উদাহরণ সেই উটের মত যে কোন কুয়াতে পড়ে যায়। অতঃপর তাকে তার লেজ ধরে তোলার অপচেষ্টা করা হয়। (যা অসম্ভব।) – আহমাদ ৩৮০১, আবু দাউদ ৫১১৯, হাকেম ৭২৭৫, ইবনে হিব্বান ৫৯৪২, বাইহাকী ২১৬০৮, সহীহুল জামে’ ৬৫৭৫, ৫৮৩৮
➧ যমীনের বুকে যখন কোন পাপের কাজ সংগঠিত হয় তখন তথায় উপস্থিত থাকিয়া যে উহাকে ঘৃণা করে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় বিবেচিত হবে যে তথায় উপস্থিত ছিল না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অনুপস্থিত থাকিয়া উহাতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে (অন্যায়কে সমর্থন বা পছন্দ করে), সে ঐ ব্যক্তির মতই অপরাধী গন্য হবে যে এসব অন্যায়ের সাথে শরীক রয়েছে (অর্থাৎ পাপ না করেও পাপী) । -আবু দাউদ, মেশকাত -৪৯১৪
নোট: যালিম, হারাম উপার্জনকারী ও বিভিন্ন কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিরা মানব সমাজের সর্বাধিক আইন/সংবিধান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। তাই মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবাধিকারকে সমুন্নত করতে কবীরা গুনাহ ও তার ইহ-পরলৌকিক পরিনাম সম্পর্কিত জ্ঞান অবশ্যই নাগরিকদের প্রতিদিনের জীবনে আত্মীকৃত হতে হবে। সে লক্ষ্য অর্জনে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এটি পাঠ্যক্রম ভুক্ত করে পড়ানো উচিত। যা মানব জীবনে বিবাদ, ঝগড়া কলহ, যুদ্ধ সংঘাত, লক্ষ লক্ষ মামলা মোকদ্দমার অশান্তি দূর করে কাঙ্খিত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং ক্ষণস্থায়ী জীবনের মূল্যবান সময়কে কল্যাণকর ও ভালো কাজে ব্যবহার এর সুযোগ অবারিত করবে। যা ব্যক্তির শুভ পরিণাম লাভে খুবই সহায়ক হবে।
১৫. ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজের নিষেধ না করা:
➧ নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে [৫] এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। সূরা মায়িদাহ ২
➧ সময়ের শপথ। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মাঝে নিপতিত। কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের। সূরা আছর,
➧ হে ইমানদারগণ! তোমারা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদেশপ্ৰাপ্ত হয় তা-ই করে। সূরা তাহরীম-৬
ব্যাখ্যা: এর উপায় এই যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন, তোমরা তাদেরকে সেসব কাজ করতে নিষেধ কর এবং যেসব কাজ করতে আদেশ করেছেন, তোমরা পরিবার-পরিজনকেও সেগুলো করতে আদেশ কর। এই কর্মপন্থা তাদেরকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে রক্ষা করতে পারবে। [ইবন কাসীর] সুত্র: তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া, সংক্ষেপিত
➧ আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে; তারাই, যাদেরকে আল্লাহ্ অচিরেই দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা তওবা-৭১
➧ আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল যেন থাকে যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে [১]; আর তারাই সফলকাম। ইমরান-১০৪
➧ অতঃপর যে উপদেশ তাদেরকে দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলে গেল, তখন যারা অসৎকাজ থেকে নিষেধ করত তাদেরকে আমরা উদ্ধার করি। আর যারা যুলুম করেছিল তাদেরকে আমরা কঠোর শাস্তি দেই, কারণ তারা ফাসেকী করত [১]। আরাফ-১৬৫
➧ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন খারাপ কাজ দেখবে, সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিহত করে, তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে মুখ দ্বারা প্রতিহত করবে (উপদেশ, ভীতি প্রদর্শন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে অবগত করার মাধ্যমে), আর যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। এটাই ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘এর পরে সরিষা পরিমাণ ঈমানও বাকী নেই। [মুসলিম ৪৯, আবু দাউদঃ ১১৪০]
➧ অন্য এক হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘যার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ করে বলছি, অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। নতুবা অচিরেই আল্লাহ তোমাদের উপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি নাযিল করবেন। তারপর তোমরা অবশ্যই তাঁর কাছে দো’আ করবে, কিন্তু তোমাদের দোআ কবুল করা হবে না। [তিরমিযীঃ ২১৬৯, মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৩৯১]
➧ অনুরূপভাবে রসূল (ﷺ) কে এক লোক জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্র রসূল, কোন লোক সবচেয়ে বেশী ভাল? তিনি বললেনঃ সবচেয়ে ভাল লোক হল যে আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন করে, সৎকাজে আদেশ দেয় ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৬/৪৩১]
➧ আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে আহবান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, ‘অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।” সূরা ফুসসিলাত-৩৩ আয়াত
➧ আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, “লোকেরা যখন দেখলো, অত্যাচারী অত্যাচার করছে, এরপর তারা এর প্রতিরোধ করলো না, এরূপ লোকদের উপর আল্লাহ্ অচিরেই মহামারী আকারে শাস্তি পাঠাবেন।” সুত্রঃ আবু দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, বিয়াদুস সালেহীন হা/১৯৭
➧ আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, “যে ব্যক্তি (কাউকে) সৎপথের দিকে আহ্বান করবে, সে তার প্রতি আমলকারীদের সমান নেকী পাবে। এটা তাদের নেকীসমূহ থেকে কিছুই কম করবে না। আর যে ব্যক্তি (কাউকে) ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করবে, তার উপর তার সমস্ত অনুসারীদের গোনাহ চাপবে। এটা তাদের গোনাহ থেকে কিছুই কম করবে না।” -মুসলিম ৬৯৮০, হাদীস সম্ভার ১৬১২
➧ উসামা ইবনে যায়িদ ইবনে হারিসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি নবী (ﷺ) কে বলতে শুনেছিঃ কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে এনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে তার
নাড়ি-ভুড়ি বেরিয়ে আসবে। সে এটা নিয়ে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে যেভাবে গাধা চাক্কীর মধ্যে ঘুরতে থাকে। জাহান্নামীরা তার চারপাশে সমবেত হয়ে জিজ্ঞেস করবে, হে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি কি সৎকাজের নির্দেশ দিতে না এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখতে না? সে বলবে, হ্যাঁ আমি সৎকাজের আদেশ দিতাম, অথচ নিজে তা করতাম না, আমি অন্যদের খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলতাম, অথচ আমি নিজেই তা করতাম। সুত্রঃ বুখারী, মুসলিম, রিয়াদুস সালেহীন হা/১৯৮
ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজের নিষেধ না করার প্রতিকারে আসমানী হেদায়াত:
➧ ইবনু মাসউদ (রা.) নাবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, আল্লাহর একজন বান্দার কবরে ১০০ বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অতঃপর সে বিরামহীন দু'আ এবং প্রার্থনা করতে থাকে ফলশ্রুতিতে ১০০ বেত্রাঘাতকে একটি করে দেয়া হয়। অতঃপর তাকে একটি বেত্রাঘাত করা হয় যার কারণে তার কবর আগুনে ভরে যায় ৷ অতঃপর যখন তার থেকে আগুন (এর আযাব) উঠিয়ে নেয়া হয় এবং সে সংজ্ঞা ফিরে পায় সে বলল, তোমরা আমাকে কি কারণে বেত্রাঘাত করেছ? (ফেরেশতারা) তারা উত্তর দিল, তুমি অযূ ছাড়া এক ওয়াক্ত সলাত আদায় করেছিলে এবং অত্যাচারিত ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলে কিন্তু তাকে (কোন) সাহায্য করনি । (সহীহাহ্ হা.২৭৭৪)
চ্যাপ্টার সংশ্লিষ্ট নোট: উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহে সৎকাজের আদেশ দানের সংগে অসৎ কাজে নিষেধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা এ আমল করে তাদেরকে সফলকাম মু’মিন বলে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা তা করে না তাদেরকে শাস্তি ও অশুভ পরিণামের দুঃসংবাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজে অনেক মুসলিম প্রচারক/ওয়ায়েজ কিছু সৎকাজ ও তার ফায়দা আলোচনা করাকেই যথেষ্ট ও হেকমতের কাজ মনে করেন। কিন্তু যখন পরিবার ও সমাজ মহা পাপাচারে সয়লাব যার ফলশ্রুতিতে মানুষের মানবাধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে, কলহ-বিবাদ ও অশান্তির আগুনে মজলুম মানুষ জর্জরিত, তখন তার প্রতিকারে অসৎকাজের পরিনাম (কলহ বিবাদ, হানাহানি, সংঘর্ষ, জেল-জরিমানা, মৃত্যুদণ্ড, খারাপ মৃত্যু, কবর ও জাহান্নামের শাস্তি ইত্যাদি) সম্পর্কে আসমানী হেদায়াতের কথা সামান্যই আলোচনা করেন, এমনকি কখনো কখোনো তা এড়িয়েও যান। এটি দ্বীন প্রচারের বিজ্ঞচিত পদ্ধতি নয় বরং আল্লাহ (যেখানে কুরআনের সর্বত্র অসৎকাজের অশুভ পরিণামের সঙ্গেই তিনি সৎকাজের পুরস্কারের কথা বলেছেন) ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) শিক্ষার অনেকটাই বিপরীত। যা কাম্য নয়। অথচ উপরে বর্ণিত মহা পাপসমূহের বিবরণ থেকে আমরা জানতে পারি যে কোন কোন কবীরা গুনাহে লিপ্ত নামাযী ও রোজাদার ব্যক্তিও নির্ভেজাল মুনাফিক হতে পারে যদিও সে নিজেকে মুসলিম মনে করে। অথচ তার পরিণাম এই যে, সে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে (যা সর্বাধিক উত্তপ্ত) শাস্তি ভোগ করবে। সুতরাং মহা পাপসমূহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞানার্জন এবং শীঘ্র তওবা করে তাক্কওয়া অর্জন করতে ব্যর্থ হলে খালি হাতেই বা মহাপাপের বোঝা নিয়েই কবরে যেতে হবে। এবং চিরস্থায়ী পরজগতে মহাপাপের ধরণ অনুযায়ী স্থায়ী বা অপরাধের ধরণ ও পরিমাণ অনুযায়ী সাময়িক শাস্তি ভোগ করতে হবে। বিশুদ্ধ আক্কিদা বিশ্বাস পোষণই এরূপ পাপাচারীকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
অসৎকর্মের সঙ্গেই মহাপাপের/পাপের সম্পর্ক। এ সম্পর্কে জ্ঞানবিমুখ জনগোষ্ঠী অন্ধকারের জীব হয়ে ওঠে। নৈতিক-অনৈতিক কোন জ্ঞান থাকে না। তাই সমাজের জ্ঞানীজন/দায়ী’ইলাল্লাহর মহৎ কাজের কাতারে যাদের শামিল হবার সৌভাগ্য হয়েছে, তাদের আরো সচেতন ভূমিকা পালন সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, ইনশা’আল্লাহ। এবিষয়ে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী পাঠকের ঈমাম গাজজালী প্রণীত এহ্ইয়াও উলুমিদ্দীন কিতাব সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।
নোট: যে সকল হাদিসে কালেমায়ে তাওহীদ এর উপর জান্নাতের প্রতিশ্রুতি অথবা জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবার কথা বলা হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞ আলেমদের মত-
প্রখ্যাত হাদীসের সংকলন গ্রন্থ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব এর সংকলক হাফীয যাকীউদ্দীন আব্দুল আযীম আল মুনযিরীর অভিমত:
যে সকল হাদিসে কালেমায়ে তাওহীদ এর উপর জান্নাতের প্রতিশ্রুতি অথবা জাহান্নাম হারাম হয়ে যাবার কথা বলা হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞ আলেমদের মত হল এই যে এগুলো ইসলামের প্রাথমিক যুগের সাথে সম্পৃক্ত যখন কেবল তাওহীদ ও ঈমানের পথে আহবান করার নির্দেশ ছিল। পরবর্তীতে যখন শরীয়তের বিধি-বিধান তথা ফরয-ওয়াজিব ইত্যাদি নাযিল হয় এবং বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির নির্দেশ আসে তখন হাদীসগুলোর বিধান রহিত হয়ে যায়। এর উপর যথেষ্ট দলিল প্রমাণ বর্তমান রয়েছে। ইতোপূর্বে সালাত যাকাত সাওম ও হজ্জ ইত্যাদি অধ্যায়সমূহ এমন অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো আমলে প্রয়োজনীয়তা ও এর গুরুত্বের নিদর্শন বহন করে। সামনেরও বিভিন্ন অধ্যায়ে এ ধরনের অনেক হাদিস আসবে। উল্লিখিত মতের পক্ষে রয়েছেন যাহ্হাক, যুহ্'রী ও সুফিয়ান সাওরী প্রমুখ আলিমগণ। অন্য একদল আলিম বলেন, এখানে হাদীসগুলো রহিত হয়ে গিয়েছে, একথা বলার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা দ্বীনের স্তম্ভ ও ইসলামের যে কোন বিধানই আল্লাহর একত্ব ও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে আবশ্যিক বিষয় সমূহের অন্তর্ভুক্ত এবং ঈমানের দাবী। সুতরাং কেউ যখন তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদানের পর অস্বীকৃতি অথবা তুচ্ছ জ্ঞান করে কোন ফরজ আদায় বিরত থাকবে, তখন তার উপর কুফর-এর হুকুম আসবে এবং জান্নাতে প্রবেশ থেকে সে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এ মতটিও পূর্বোক্ত মতের কাছাকাছিই। অপর একদল বলেন, কালেমায়ে তাওহীদ উচ্চারণ জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে নিরাপদ থাকার দাবি করে। কিন্তু শর্ত এই যে, উচ্চারণকারী ফরজ সমূহ আদায় করবে এবং কবিরা গুনাহ সমূহ থেকে বেঁচে থাকবে। তাই সে যদি ফরজ পালন না করে এবং কবিরা গুনাহ সমূহ থেকে বিরত না থাকে, তবে তার এই কালেমা পাঠ জাহান্নামে প্রবেশে অন্তরায় হবে না। এ মতটি পূর্বোক্ত মতের মতই অথবা এটি অবিকল পূর্বোক্ত মতটিই। এ ব্যাপারে আমরা আমাদের কিতাবে ভিন্নমত সহ বিস্তারিত আলোচনা করেছি। মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। সূত্রঃ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, যিকির ও দোআ অধ্যায়